এখন, কোনো একটা সময় ওড়িয়ারা আবিষ্কার করলেন যে উপকূল বরাবর বয়ে যাওয়ার কাজটা অত্যন্ত পরিশ্রমসাপেক্ষ, এবং আমার মনে হয় যে কেউ একজন দক্ষিণদিকে গিয়েছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন যে উপকূল ধ’রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার চাইতে শীতকালীন মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণদিকে বয়ে গিয়ে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া এবং স্রোত, অর্থাৎ নিরক্ষীয় স্রোতকে কাজে লাগিয়েসুমাত্রা, জাভা ইত্যাদি অঞ্চলে যাওয়াটা অনেক বেশি সহজ।

তো এখন হয়েছে কি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতবর্ষের বাণিজ্যের অভিমুখেরএটি একটি বেশ আকর্ষণীয় পরিবর্তন, আগে এটি ছিল থাইল্যান্ড হয়ে, ক্রা-এর ইস্থমাস থেকে ভিয়েতনাম অব্দি, এখন হঠাৎই এর অভিমুখ পরিবর্তন হয়ে গেল দক্ষিণে শ্রীলঙ্কার দিকে, তারপর স্রোতকে কাজে লাগিয়ে দিক পরিবর্তন ক’রে জাভা, বালি, সুমাত্রা ইত্যাদির দিকে এবং এই জায়গাগুলিতে এই একই সময়ে ভারতীয় সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এখন যেটা খুবই কৌতূহলের বিষয় তা হ’ল যে বালি অথবা জাভাতে গেলে প্রভূত মাত্রায় ভারতীয় প্রভাব খুব স্বাভাবিকভাবেই চোখে পড়ে, তাতে বোঝা যায় যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান কী পরিমাণে চলছিল। কিন্তু ভারতে আমরা প্রায়ই ধরে নিয়ে থাকি যে এমনটা ঘটেছে অনেক অনেক পরে, তামিল প্রভাবের ফলে, কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়।

প্রকৃতপক্ষে পূর্ব ভারত মহাসাগরের আসল মহান পথিকৃৎ হলেন ওড়িয়ারা এবং এটা অন্য অনেক কিছুর মধ্যে দিয়েই পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়।আজওদক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ জায়গায় ভারতীয়দের জন্য প্রযুক্ত  স্থানীয় চলিত শব্দটি হ’ল “ক্লিং”।অবশ্যই এই শব্দটি এখন অনেকটা মর্যাদাহানিকর অর্থে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এই ক্লিং বা কলিং শব্দটি নিশ্চিত ভাবেই কলিঙ্গ শব্দ থেকে এসেছে, এই শব্দটিই এখন চলতি অথবা স্থানীয় ভাষায় ভারতীয় অর্থে ব্যবহৃত হয়। মালয়ের সমস্ত ভাষায় পশ্চিম শব্দটিকে বোঝাতে ভারত শব্দ ব্যবহৃত হয়। তাহলে দেখতেই পাচ্ছেন যে কেন তাঁরা দেশের নাম ইন্ডিয়ার নামে রেখেছেন সে ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়ার দিকে পরিষ্কার স্মৃতি রয়েছে।

এখন তাহলে আমাদের দিকে সেই সময়কার কোন্‌ স্মৃতি বেঁচে রয়েছে? দেখবার মতো বিষয় হচ্ছে যে এটি অনেক ভাবেই বেঁচে রয়েছে যা কিনা আমাদের চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও, এই সেদিন অব্দিও, আমরা তার পুরোপুরি কদর করতে পারিনি। ওড়িশার অন্যতম বড় উৎসব হচ্ছে কার্ত্তিক পূর্ণিমা, এখন এই কার্ত্তিক পূর্ণিমায় ঠিক কী হয়ে থাকে? আসলে কার্ত্তিক পূর্ণিমার সময় যখন পূর্ণিমা হয়েছে, তখন আপনাকে সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়তে হবে এবং বিশেষ ক’রে নারী এবং শিশুদের নদী কি সমুদ্র কিংবা কোনো জলাশয়ের কাছে যেতে হবে এবং একটি প্রদীপ একখানা ছোট নৌকোয় ক’রে নদী কিংবা জলাশয়টির জলে ভাসিয়ে দিতে হবে। এখন প্রশ্ন হ’ল, এর তাৎপর্য ঠিক কী? এর তাৎপর্য হ’ল এইরকম –দেখুন আসলে কার্ত্তিক পূর্ণিমার সময়টার কাছাকাছি হয় কি, বায়ুর দিক পরিবর্তন ঘটে। দক্ষিণ দিক থেকে উত্তরের দিকে বায়ু বওয়া বন্ধ হয় এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে বওয়া শুরু হয়। তাহলে এখানে ঠিক কী ঘটছে? আসলে এটা হচ্ছে সেই সময় যখন ওড়িয়া নাবিকেরা তাঁদের যাত্রার জন্য রওনা হতেন। তাহলে এটা হচ্ছে আসলে, এঁরা কী করছেন? পরিবারের লোকজন নাবিক এবং বণিকদের বিদায় জানাচ্ছেন, যখন এঁরা পাল তুলে দিয়েছেন যাত্রার জন্য এবং প্রায় ওই একই সময়ে কটকে এমন কি আজ অব্দি বালি যাত্রা নামে একটা মেলা হয়ে থাকে, যার আক্ষরিক অর্থ হ’ল বালির উদ্দেশ্যে যাত্রা।

একবার ভাবুন এই ব্যাপারটা নিয়ে, আমাদের ঠিক চোখের সামনে এই সত্যিকারের সভ্যতার স্মৃতি বেঁচে রয়েছে, এবং আমি এমনটা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বছরদুয়েক আগে আমি কোনার্কের সমুদ্রতটে যাই এবং একটি অসাধারণ ঘটনার অভিজ্ঞতা লাভ করি, সত্যি সত্যি এঁরা একরকম নাটক মঞ্চস্থ ক’রে থাকেন এবং টাপোই এর ব্যাপারে একটি গল্প রয়েছে, আপনাদের মধ্যে যাঁরা ওড়িয়া তাঁরা গল্পটা জেনে থাকবেন হয়তো,কিন্তু এই গল্পটা একটি ছোট মেয়েকে নিয়ে, যাকে নিজের ননদের সঙ্গে ছেড়ে রেখে যাওয়া হয়েছিল, যখন তার বাবা এবং দাদারা অনেক দূর দেশে যাত্রা করেছিল, এবং কিভাবে ননদ তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, এবং তারপর সে কিভাবে দেবী মনসার কাছে প্রার্থনা করেএবং জানেন কি, তার ভাইয়েরা সব ঠিক সময়ে, তার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটবার আগেই, ফিরে আসে এবং তাকে উদ্ধার করে।

যাই হোক, এটি একটি লোককথা, কিন্তু এখানে পরিষ্কার যে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সঙ্গে বিদেশ যাত্রার এই সংযোগ এখনো পর্যন্ত রোজকার সাংস্কৃতিক উপাদানে ভীষণ রকম ভাবে জীবিত রয়েছে এবং কোনার্কের মন্দিরেও ব্যাপারটি দেখানো হয়েছে।