আমি গুজরাতের কথা দিয়ে শুরু করব, কারণ আমার কাহিনি গুজরাত এবং হরপ্পার সময়ে গুজরাতের উপকূল থেকেই শুরু হয়, যা কিনা এখনকার চেয়ে দেখতে বেশ আলাদা ছিল। লোকে ভাবে যে সমুদ্রতল একভাবে বাড়তে থাকে এবং তারপর একভাবেই নামে, কিন্তু আসলে তা ঘটে না। ওইসব বড় বড় ওঠা এবং নামার মধ্যে অনেক রকম বৈচিত্র্য রয়েছে।

তো হরপ্পার সময়কালে সমুদ্রতল আসলে এখনকার চেয়ে একটু উঁচুই ছিল এবং সৌরাষ্ট্রের উপদ্বীপ অঞ্চল আসলে একটি দ্বীপ ছিল এবং আপনি সত্যিই খাম্বাত উপসাগর থেকে সৌরাষ্ট্র হয়ে যাকে কচ্ছের রান বলা হয় সেখানে যেতে পারতেন কারণ কচ্ছের রান আসলে জলপথে যাতায়াতের উপযোগী ছিল, এবং শুধু তাই নয়, এতে দুটি বড় নদী এসে মিশতো। সিন্ধু নদ, যা আসলে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্তও কচ্ছের রানে এসে মিশতো, এবং অবশ্যই সরস্বতী নামের বৃহৎ নদীটি ছিল, যা এখানে এসে মিশেছিল, এবং কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই দুটো নদী এখানে এসে মিশতো। এমনকী আজকের দিনেও এক্তু কষ্ট করলেই আপনি বুঝতে পারবেন যে এই দুটো পুরনো নদীখাত রয়েছে যা ওখানে এসে মিশেছিল, এবং অবশ্যই আবহাওয়া ও জলবায়ু বেশ আলাদা ছিল, এখন যা তার চেয়ে অনেক আর্দ্র ছিল।

তাই এখন যাকে বালোচিস্তান বলা হয় সে জায়গাটি সাভানা অঞ্চল ছিল, প্রাচীন মানুষের পরিযাণের অনেকটাই এই অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ঘটেছিল। এটা মনে রাখাটা জরুরি কারণ বর্তমানে এই অঞ্চলটি এতই দুর্গম মরুভূমি, যে আমরা ভাবি যে এ তো জানা কথা যে লোকে চাইলেই এখান দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে না। প্রাক্‌-আধুনিক কালের আগে যদি আপনি ইরান থেকে ভারতবর্ষে আসতে চাইতেন তাহলে আপনাকে আফগানিস্তানের মধ্যে দিয়ে যেতে হ’ত, তবে এমনটা কিন্তু ইতিহাসে সবসময় হয়ে আসেনি।

তা সে যাই হোক, এই উপকূলটি ছিল এবং এই উপকূলে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ থেকে নানান শহর গজিয়ে উঠতে আরম্ভ করে, এবং তারপর এবং খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে এগুলি সত্যিই ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং এদের মধ্যে আমরা সবচেয়ে বড় যে শহরটি এখনো অব্দি আবিষ্কার করতে পেরেছি সেটি হ’ল ঢোলবীর। আজকের দিনে ঢোলবীর কচ্ছের রানের মূল ভূখণ্ডের অনেকখানি ভেতরে। আমি আগেই বলেছি, কচ্ছের রান বর্তমানে একটি নোনা সমতলভূমি, যা কখনো কখনো বর্ষাকালে জলাভূমি হয়ে থাকতে পারে, অন্য সময়ে নোনা সমতল এবং ঢোলবীর অনেকটা সেই টিলার মতো যা কিনা নোনা সমতল এলাকাটির মাঝখানে একলা দাঁড়িয়ে আছে। । কিন্তু হরপ্পার সময়ে এটি একটি দ্বীপ হয়ে থাকতে পারে এবং তারপরে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত হয়, তবে অন্য আরও বন্দর ছিল এবং তাদের মধ্যে একটি হ’ল লোথাল, আমি নিশ্চিত যার কথা আপনারা সবাই ইতিহাস বইয়ে প’ড়ে মনে রেখেছেন, যেখানে কিছু শুকিয়ে যাওয়া জাহাজঘাটা ছিল ইত্যাদি। কিন্তু গুজরাতের যে মানচিত্র আমি এখন আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম, যেখানে সত্যিই নৌকাযোগে লোথাল থেকে ঢোলবীর যাওয়া সম্ভব হ’ত, এবং একইভাবে অন্য দিকটিতে অর্থাৎ উত্তরদিকে এখন যেখানে দ্বারকা সেদিক থেকে প্রবেশ করবার একটি পথ ছিল, যেখানে ছিল, এমনকি এখনও আছে, একটি দ্বীপ যার নাম বেট দ্বারকা, সেখানেও অনেক হরপ্পার প্রত্নসামগ্রী পাওয়া গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা ব্যাপারটা অনুমান করছি, তবে বোধহয় ওখানে আসলে যা চলছিল তা হ’ল গুজরাতের এই বন্দরগুলির সমন্বয়, যেগুলি থেকে এঁরা নানা স্থানে আনাগোনা করতেন, যাঁরা দক্ষিণের দিক থেকে আসছেন তাঁরা খুব সম্ভবতঃ লোথাল হয়ে এখানে আসতেন, যেটা সম্ভবতঃ ঢোলবীর পৌঁছোবার আগে স্থিত শুল্ক আদায়কারী থানা ছিল, এবং খুব সম্ভবতঃ পশ্চিমদিক থেকে আসা লোকেদের জন্য বেট দ্বারকায় আরও একটি শুল্ক আদায়কারী স্থান ছিল এবং এটি ডিঙিয়েই তাঁরা ঢোলবীরের দিকে যেতে পারতেন, যেখানে কিছুটা ব্যবসা ক’রে তারপর হয়তো এদের কেউ কেউ সিন্ধু নদ দিয়ে, এবং যতদিন সরস্বতী নদী বইত ততদিন সরস্বতীর স্রোতের উল্টোদিকে বয়ে উত্তরে যাবার রাস্তা ধরত।