আমরা এখন যা নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি, অর্থাৎ ভারত মহাসাগরের প্রাকৃতিক ভূ-চিত্র বিষয়ে, সে ব্যাপারে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে এই ভূ-বৈচিত্র্য জীবন্ত, স্থাবর নয়, তীরভূমির ক্রমাগত ওঠানামা এবং সরে যাওয়ার কারণে এবং টেকটনিক চলনের জন্য এখানকার উপকূলভাগ নিয়ত পরিবর্তনশীল, এবং এটা ততক্ষণ মনে রাখা খুবই জরুরি, যতক্ষণ আমি এ বিষয়ে বলছি। যদি আপনি পৃথিবীর এই প্রান্তে সেই সময়ে আসতে পারতেন, যে সময়ে ভারত মহাসাগরের গঠন হয়েছে, অর্থাৎ সর্বশেষ তুষার যুগ চলাকালীন, যা কিনা আজ থেকে আট-নয় হাজার বছর আগে শেষ হয়েছে, তবে আমি আসলে বলছি প্রায় চোদ্দ হাজার বছর আগেকার কথা,

সেক্ষেত্রে আপনারা যে উপকূল দেখতে পেতেন তা আসলে খুবই আলাদা হয়ে থাকতে পারত। পৃথিবীর বেশিরভাগ জলই এইসব বিশাল বরফের চাদরে জমা ছিল, যেগুলি উত্তর গোলার্ধের বেশিরভাগ এলাকা ঢেকে রেখেছিল, এবং দক্ষিণ গোলার্ধেরও কিছু অংশ ঢেকে রেখেছিল, আর এখন জলস্তর যেখানে তার চাইতে আরও ১০০-১৫০ মিটার নিচে ছিল। এর ফলে, যেমন পারস্য উপসাগরের সবটাই আসলে সমতল এলাকা ছিল, তেমনি এখন যাকে গুজরাট হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় তা মূল ভূখণ্ডের অনেকটাই ভেতরে ছিল এবং উপকূলতট খানিকটা সরলরেখার মতো দক্ষিণদিক বরাবর বিস্তৃত ছিল।

শ্রীলঙ্কা ভারতের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমস্ত দ্বীপগুলি, তাদের প্রায় সবগুলি একটিমাত্র বিশাল ভূখণ্ডের অংশ ছিল, যাকে এখন আমরা বলে থাকি সুন্দাল্যান্ড। আসলে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের পূর্বপুরুষরা সত্যিই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পুরোটা হেঁটে পার হয়ে তারপর একটি ছোট যাত্রায় অস্ট্রেলিয়ায় এসে পোঁছেছিলেন, অতএব এই ছিল এখানকার ভূচিত্র।

এবারে, আজ থেকে প্রায় ১২০০০ বছর আগে শুরু হয়ে এইসব গলতে থাকা হিমবাহ এবং বরফের চাদর এই উপকূলগুলিকে প্লাবিত করতে শুরু করে, ফলে উদাহরণ হিসেবে দেখতে পাওয়া যাবে, পারস্য উপসাগর প্লাবিত হচ্ছে, ভারতীয় উপকূল অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে, শেষমেশ শ্রীলঙ্কা ভারতের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে, ইত্যাদি, এবং এমনটা খুবই সম্ভব যে এই ঘটনাকে, যেহেতু এটি একটি খুবই সর্বনাশা অধ্যায় ছিল, স্মৃতিতে ধ’রে রাখা হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত সংস্কৃতির মহাপ্লাবনের মিথকথাগুলির মাধ্যমে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নোয়াকে নিয়ে একটি গল্প আছে, আবার গিলগামেশের ব্যাপারে একটি সুমেরীয় গল্পও আছে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের নিজস্ব মহাপ্লাবনের মিথকথা রয়েছে, এবং অবশ্যই আমাদেরও একটি মহাপ্লাবনের পুরাণকথা আছে, মনু এবং মৎস্য অবতারের ব্যাপারে, যা কিনা বিষ্ণুর প্রথম অবতার।

ফলে এই সমস্ত প্লাবনসংক্রান্ত মিথকথাগুলি রয়েছে, এর থেকে সঠিক ইতিহাস নির্ণয় করা খুবই কঠিন, তবে অন্ততঃ এমনটা আমাদের বিশ্বাস করতে খুবই ইচ্ছে করে যে এগুলি সেই সময়কার একটি স্মৃতি। তবে নিশ্চয়ই ৫০০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ নাগাদ বা তার কাছাকাছি সময়ে উপকূলগুলি এখনকার সময়ের মতো রূপ নিতে শুরু করে যার সঙ্গে আমরা পরিচিত, তবুও কিছুটা পার্থক্য রয়ে গেছিল।