প্রাচীন ইতিহাস সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা

ভারতবর্ষ-অভিমুখী বাণিজ্যপথ, ভারতবর্ষে বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত এবং রোমান অর্থনীতিতে তার প্রভাব

ভারত মহাসাগরের পশ্চিমভাগে একই রকম ব্যাপার ঘটছিল, কারণ ভারতীয়রা রোমান সাম্রাজ্যের সাথেও বাণিজ্য করতে শুরু করেছিল, এবং এই রোমান সাম্রাজ্যের গোড়ার কথা এবং সেই সময় কী কী ঘটছিল সে সব লিখে রাখা হয়েছে “দ্য পেরিপ্লাস অফ দি ইরিথ্রিয়ান সী” নামের একটি পুস্তকে। এই একটি আকর্ষণীয় পুস্তক। এটি গ্রীকে লেখা, একটি গ্রীক-মিশরীয় পুস্তক এবং এটি আমাদের স্পষ্ট জানায় কোন্‌ পথে রোমান সাম্রাজ্যের বণিকরা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করতে আসতেন।

তাহলে এর শুরুকোথায় হ’ত? দুটি জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করা হ’ত, হয় আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে নয়তো টায়ার অথবা সিডন থেকে শুরু করা যেত। আলেক্সান্দ্রিয়ায় যাত্রা শুরু করা হ’লে নীলনদ ধ’রে স্রোতের অভিমুখে কিছুদূর বয়ে গিয়েএবং তারপরে একটি খাল পড়ত যা কিনা সত্যিই নীলনদকে বর্তমান কায়রোকে যে অঞ্চলে এখন সুয়েজ খাল রয়েছে তার কাছাকাছি একটি স্থানের সঙ্গে যুক্ত করত। অতএব আপনারা আজকের দিনে যে সুয়েজ খাল দেখতে পান সেটিসুয়েজের আদিরূপ নয়, হাজার হাজার বছর আগেও একটি খাল ছিল। অবশ্যই যে সমস্যাটি ছিল তা হ’ল এই এলাকা বালুকাময়, ফলে একে পরিষ্কার রাখা সবসময়েই খুব কঠিন ছিল, কিন্তু এটিকে চালু রাখবার জন্য একাধিক প্রচেষ্টা করা হয়েছিল।

আরও একটি পথ ছিল, এই পথ ধ’রে আরো কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর প্রথম যে জলপ্রপাতটি পড়ত সেখান থেকে বের্নিকা নামে একটি জায়গায় যেতে হ’ত। এখান থেকে আপনাকে উটে চেপে নীলনদ থেকে সমুদ্রতীরে আসতে হবে। আরেকটি পথ ছিল, এবং আরো একটি যার কথা আমি বলেছি, যা কিনা লেবানন থেকে বর্তমান ইজরায়েল হয়ে মরুভূমি এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে গিয়ে এখনকার পেট্রাতে গিয়ে পড়ত।এইজন্যে পেট্রা এত সম্পদশালী ছিল, কারণ এটি ক্যারাভানের পথে পড়ত। তারপর এই পথ গিয়ে পড়ত আকাবা নামে একটি জায়গায়। যাই হোক, আপনি যে পথেই আসুন না কেন, আপনি লোহিত সাগরে এসে পৌঁছতেন এবং তারপর আসলে আপনাকে এই সরু, সংকীর্ণ লোহিত সাগরের দু-তীরে বাণিজ্য করতে করতে বয়ে যেতে হ’ত।আপনাকে এর মধ্যে দিয়ে বাণিজ্য করতে করতে বয়ে যেতে হ’ত।ঘটনাচক্রে ইরিথ্রিয়ান সমুদ্রের ‘ইরিথ্রিয়ান’ – এই গ্রীক শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হ’ল লাল এবং তাই আসলে এর এমন নাম হয়েছে।

যাইহোক, অতদূর আসবার পর তারা ইয়েমেনে পৌঁছত, এবং ইয়েমেন থেকে একটি নাতিদীর্ঘ যাত্রা ক’রে একটি ছোট দ্বীপে এসে পৌঁছত যার নাম সোকোত্রা। এখন প্রশ্ন হ’ল, একে সোকোত্রা বলা হয় কেন? এই নামের উৎস হচ্ছে আসলে সুখদ্বার দ্বীপ – যে দ্বীপে সুখ মেলে এবং এই দ্বীপে ভারতীয় এবং আরবদের আধিক্য ছিল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যস্থল ছিল, এখনও সেখানকার নানান গুহায় ভারতীয় বণিকদের এঁকে যাওয়াবিভিন্ন ধরণের দেয়ালচিত্র মেলে।এই স্থান থেকে যাবার জন্য দুটি বিকল্প পথ ছিল, এখান থেকে পুরনো রাস্তা ধ’রে উত্তরে ইয়েমেনের দিকে বালোচ উপকূল বরাবর গিয়ে গুজরাত প্রভৃতি স্থানে পৌঁছনো যেত এবং তারপর দক্ষিণদিকে যাওয়া যেত।

তবে খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে কোনো এক সময় হিপালুস নামের এক বুদ্ধিমান ব্যক্তি আবিষ্কার করলেন যে এইভাবে ঘুরপথে যাবার কোনো মানে হয় না, বরং আবার সেই মৌসুমী বায়ুকে কাজে লাগিয়ে জলপথে যাত্রা করে সোজা কেরালা অব্দি পৌঁছনো যেতে পারে এবং তার কিছু পরেই কেরালায় মুচিরি বা মুজিরিস নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর গড়ে ওঠে, যা বর্তমান কোচি অঞ্চলের সামান্য উত্তরে পত্তনম নামের একটি গ্রামের কাছে রয়েছে, সেখান থেকে ওই সময়কার অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী পাওয়া গেছে। তাই হঠাৎ ক’রে এবং খুব নিশ্চিতভাবে আদি রোমান পর্বঅথবা তারও আগে যখন রোমান সাম্রাজ্য কেবলমাত্র একটি জনপদ ছিল সেই সময় থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যের পথগুলি আবিষ্কৃত হ’তে থাকে। এটা সেই সময়কার কথা যখন ইহুদিদের মহান মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে, এসময় বেশ কিছু সংখ্যক ইহুদি এই উপকূলে এসে বসত করতে শুরু করে ইত্যাদি।

তাহলে এরা কোন্‌ কোন্‌ পণ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যেবাণিজ্য করত? এখন, পেরিপ্লাস থেকে আমরা জানতে পারি যে ভারতীয়রা অন্যান্য জিনিস ছাড়াও তুলো – যা কিনা অত্যন্ত মহার্ঘ ছিল, বিশেষ করে গুজরাত অঞ্চলের তুলো– রপ্তানি করত। লোহা এবং ইস্পাতের সামগ্রীও রপ্তানি হ’ত, কারণ আমি আগেই বলেছি যে লোহা তো ভারতীয় উদ্ভাবন বটেই, এমনকী বহু দিন পর্যন্ত ভারতীয় ধাতুবিদ্যা খুব উচ্চমানের ব’লে গণ্য করা হ’ত। ফলে সব ধরণের ইস্পাত ও লোহার উপকরণ পাওয়া যেত এবং মুচিরি এলাকা থেকে আসা লোকেরা মশলাপাতি রপ্তানি করত, বিশেষ করে কালো মরিচ, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আমদানি করা অনেক ধরণের মশলাও মুচিরিতে আনা হ’ত এবং তারপর ভারতীয়রা তখন সেইসব ইন্দোনেশীয় মশলাপাতিকে ভারত থেকে রোমান ও অন্যদের কাছে চালান করত। তো এই গেল ভারতীয়রা কি কি রপ্তানি করত তার কথা।

এবার তাহলে ভারতীয়রা কি কি আমদানি করত? অন্যান্য জিনিস ছাড়াও ভারতীয়রা ইতালির সুরা আমদানি করত এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে এমনটা জানা গেছে যে তারা রাজারাজড়ার হারেমের জন্য নারী আমদানি করত। অতএব এর থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসা যায়, সেটি হ’ল –প্রাচীন সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস প’ড়ে আমরা জানতে পারি যে প্রাচীনকালেও প্রমোদ-সমাবেশ অনুষ্ঠানগুলিতে বিদেশি মদ ও বিদেশি গণিকা অপরিহার্য ছিল।

এখন সেই সময়ে, এত বেশি বাণিজ্যের কারণে একখানি মস্ত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সেটা হচ্ছে এই, যদিও ভারতীয়রা প্রভূত পরিমাণে মদ ও নারী আমদানি করত, তবু তাদের রাজকোষে প্রচুর উদ্বৃত্ত অর্থ জমছিল। এখন, প্রাচীন যুগে উদ্বৃত্ত অর্থ নিয়ে কী করা যেতে পারে? তা দিয়ে সোনা কেনা যেতে পারে এবং রোমানরা এত লক্ষ লক্ষ সোনার মোহর রপ্তানি করছিল যে সেটা তাদের জন্য একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ এত বেশি সোনা অন্য কোনো দেশে চালান করা হ’লে নিজের দেশে মুদ্রা বানানোর জন্য যথেষ্ট সোনা থাকে না। এবং খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে রোমান সাম্রাজ্য একটি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল, আপনারা জানেন যে সেখানকার সেনেটেপ্লিনীর মতো ব্যক্তিত্ব এবং অন্যান্যরা জোরদার সওয়াল করেছিলেন এই গুরুতর সমস্যাটি নিয়ে, যে তাঁদের দেশে নিজেদের মুদ্রা বানানোর জন্য যথেষ্ট সোনা নেই এবং এই ভারতীয়দের ব্যাপারে কিছু একটা করা দরকার। ফলে সম্রাট ভেস্পাসিয়ান সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি ভারতীয়দের সঙ্গে বাণিজ্যের উপর এক প্রকার নিষেধাজ্ঞাই ঘোষণা করবেন এবং প্রথমদিকে তিনি খুব চেষ্টা করলেও অবশ্যই যেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা হ’ল ভারতীয়রা এবং ইহুদিরা দুপক্ষই খুব শিগগিরি চোরাচালান করবার নানান পথ খুঁজে বের করে এবং সম্রাটের পুরো প্রচেষ্টাটাই ব্যর্থ হয়।

তাই কিছুদিন বাদে তারা আবার বাণিজ্য চালু করে, কিন্তু এবারে রোমানরা ঠিক করে যে তারা এইবার তাদের স্বর্ণমুদ্রায় সোনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে ব্যাপারটা সামাল দেবে। ফলে তারা নিজেদের মুদ্রার অবমূল্যায়ণ ঘটাতে আরম্ভ করে। এবার তাহলে ভারতীয়রা এর জবাবে কী করেছিল? ভারতীয়রা ওই মুদ্রাই গ্রহণ করতে থাকে, ফলে আপনি যদি সারা ভারতে উপকূল বরাবর প্রত্নতাত্ত্বিক খননের স্থানগুলিতে যান, তাহলে আপনি প্রচুর মুদ্রা পাবেন এবং আপনি যে যুগের অঞ্চলে যাচ্ছেন সেই যুগের হিসেবে সোনার পরিমাণ কমতে থাকবে।

Leave a Reply

You may also like

ইসলামী আক্রমণ ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

ঔরংজেবের শেষ অভিযান এবং তার চূড়ান্ত পরাজয়

post-image

 

তো সেই সময়ে ঔরংজেব ঠিক করল যে আমি শেষ অভিযানে বেরবো,সমস্ত দুর্গ দখল করবো এবং পশ্চিম মহারাষ্ট্রে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করবো। আর এর ফলে, ১৭০০ সালে, ৮৫ বছর বয়সে ঔরংজেব তার জীবনের সর্বশেষ অভিযানে বেরোল। ধ’রে নেওয়া হয়েছিল যে সেটি মুঘলদের জন্যে একটি সহজ অভিযান হতে চলেছে, যে অভিযানে তারা সমস্ত দুর্গ দখল ক’রে নেবে এবং যেহেতু ক্ষমতা রয়েছে একটি ২৫ বছর বয়স্ক নারীর হাতে, তাই মারাঠাদের দিক থেকে কিছুই করা হবে না। এর চেয়ে বড় ভুল সে হয়তো আর করেনি, কারণ সে যুদ্ধ করত,সে একটা ক’রে দুর্গে যেত, যুদ্ধ করতেই থাকত, করতেই থাকত, আর ওদিকে মহারাণী তারাবাই স্বয়ং সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। যাঁরা কেল্লার হয়ে যুদ্ধ করছিলেন, তাঁদের অনেক চিঠি পাঠানো হ’ত এই ব’লে যে তাঁরা মুঘলদের দূর করবার কাজটা বেশ ভালভাবেই সামলাচ্ছেন। এই স্থানগুলিতে মোটামুটি বছরখানেক ধ’রে যুদ্ধ চলত, শেষমেশ তাঁরা আগেকার নীতি অনুসরণ ক’রে দুর্গ বেচে দিতেন, মুঘলদের এইসব দুর্গ বেচা হ’ত চড়া দামে কারণ…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধের ফলে বহু জায়গায় মুঘলদের পরাজয় ঘটেছিল

post-image

তো এই ছিল ১৬৯০-এর দশকে সংঘটিত যুদ্ধের প্রভাব, যার ফলে মারাঠারা খুবই শক্তিশালীসৈন্যদল গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল। তারা এই একই গেরিলা যুদ্ধনীতির আশ্রয় নিয়েছিল যাতে আঘাত হেনেই দ্রুত পলায়ন করতে হয়, এটি আসলে ছিল দীর্ঘকাল ধ’রে বারবার আক্রমণ হেনে অপর পক্ষকে দুর্বল বানিয়ে ফেলবার যুদ্ধনীতি, এবং বহু জায়গায় এভাবে যুদ্ধ হয়ে থাকে।

এর ফলস্বরূপ মুঘল রাজকোষ একেবারে শূন্য হয়ে পড়েছিল। এই যুদ্ধে তাদের প্রতি বছর প্রায় ১৫০০০ লোকক্ষয় হচ্ছিল। শাহজাহান, জাহাঙ্গীরের সময়কার ধনরত্ন, একেবারে আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের সময়কাল থেকে সঞ্চিত ধনরাশি, লালকেল্লায় রক্ষিত যেসব সিন্দুক কোনোদিন খোলাই হয়নি, সেসবও খোলা হতে লাগল পাওনাদারের অর্থ পরিশোধ করবার জন্য। অনেক জায়গায় মারাঠারা কোনো একজন মুঘল সেনাপতিকে বন্দী ক’রে তার মুক্তিপণ হিসেবে অর্থ চাইত, পেয়ে গেলে তাকে ছেড়ে দিয়ে পিছু হটত। অনেক জায়গায় আবার দুর্গটিকেই বেচে দেওয়া হ’ত, প্রথমে দুর্গরক্ষার জন্যলড়ে যখন দেখা যেত যে লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব, তখন তারা অর্থ দাবী করত, অর্থ আদায় করত, দুর্গটি…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

মারাঠা সেনানায়ক সান্তাজি ঘোরপাড়ে কর্তৃক ঔরংজেবের শিবির আক্রমণ

post-image

সান্তাজি ঘোরপাড়ের নেতৃত্বে একটি অত্যন্ত দুঃসাহসী আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তাও আবার একেবারে ঔরংজেবের নিজের শিবিরে। সেই সময়ে ঔরংজেবের শিবির ফেলা হয়েছিল, কোরেগাঁও অঞ্চলে শিবিরটি ছিল, এই অঞ্চলটি পুণার কাছে অবস্থিত এবং তারা সেখান থেকে চাকানের দুর্গটি দখল করার ছক কষছিল। তার গোটা শিবিরটিই ওখানে ফেলা হয়েছিল। তবে সান্তাজি ঘোরপাড়ে এবং তাঁর চরেরা সেই শিবিরের গোটা নকশাটি নিখুঁতভাবে জেনে নিয়েছিলেন।আপনারা দেবগিরির যাদবদের সময়কালে যা ঘটেছিল তার সঙ্গে এই ঘটনাটির তুলনা করতে পারেন। মাত্র পনেরো মেইল দূরত্বে কি ঘটছে না ঘটছে সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণাই ছিল না। সান্তাজি ঘোরপাড়ে গোটা শিবিরের নকশাটি খুঁজে পেতে সমর্থ হয়েছিলেন, কোথায় ঔরংজেবের তাঁবু, সৈন্যদের তাঁবুই বা কোথায় সবই তাঁর নখদর্পণে ছিল।

রাতের বেলা ঘোর অন্ধকারে তিনি প্রবেশ করতে পেরেছিলেন, তবে এক প্রহরী তাঁর পথ আটকেছিল। তাঁর সঙ্গে প্রায় পঞ্চাশজন সৈনিক ছিল, অর্থাৎ সান্তাজি ঘোরপাড়ের সঙ্গে, গোটা পরিকল্পনাটি ছিল এইরকম –ঔরংজেব যেখানে রয়েছে সেই তাঁবুতে গিয়ে তার মাথাটি কেটে সঙ্গে ক’রে বিশালগড়ে…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

শিবাজির দাক্ষিণাত্য অভিযানে যাওয়ার কারণ

post-image

 

এই কাজটি সেরে, অভিষেক সম্পন্ন হবার পর,ছত্রপতি শিবাজি দাক্ষিণাত্য অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন এবং তিনি একেবারে জিঞ্জী পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় আস্ত একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন, এটি আপনারা দেখতে পাবেন যে এটি ছত্রপতি শিবাজির গড়ে তোলা রাজত্বের একেবারে কেন্দ্রীয় অংশ। এটিই স্বরাজ্য, যা কারওয়ার থেকে শুরু ক’রে একেবারে নাসিকের উত্তরে, প্রায় গুজরাটের সীমা অবধি বিস্তৃত। তবে ১৬৭৬ সালে তিনি যে দাক্ষিণাত্য বিজয়ে বেরোলেন, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি  কারণ হ’ল, আদিল শাহীর রাজত্ব খুবই সম্পদশালী ছিল। আদিল শাহী রাজত্ব এই অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। এছাড়াও এ অঞ্চলে ছিল কুতব শাহী রাজত্ব। একবারে দক্ষিণদিকে বেশ কিছু প্রায়-স্বাধীন হিন্দু রাজাদের রাজত্ব ছিল, ফলে একটি কারণ ছিল এখানকার ধনসম্পদ।

দ্বিতীয়তঃ তিনি একটি বিকল্প হাতে রাখতে চাইছিলেন, অথবা পশ্চাদপসরণ করবার প্রয়োজনে স্বরাজ্যের দক্ষিণে একটি বিকল্প এলাকা খুঁজছিলেন, কারণ যদি উত্তরদিক থেকে কোনো আক্রমণ আসে, তাহলে যাওয়ার জায়গা কোথায়? সেক্ষেত্রে তাঁদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে, তাঁদের পিছু হটবার মতো একটা…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

মুঘল আগ্রাসনের আসন্ন বিপদ এড়াতে ছত্রপতি শিবাজি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন

post-image

 

এবার আমরা আসি দুর্গগুলির কথায়, আমি আগেই বলেছি কীভাবে দেবগিরির দুর্গটির জন্য যুদ্ধ হয়েছিল এবং সে যুদ্ধে পরাজয় ঘটেছিল। এবং শিবাজি যা করেছিলেন তা হ’ল – তিনি দুর্গ তৈরি করবার প্রণালীতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। তিনি একাধিক প্রবেশ এবং নিষ্ক্রমণের পথ তৈরি করিয়েছিলেন। আপনি যদি মহারাষ্ট্রে যান, তাহলে দেখতে পাবেন যে প্রত্যেকটি দুর্গের একাধিক প্রবেশ এবং নির্গমন পথ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এই হ’ল তোরনার দুর্গ, এখানে জুঞ্জার মাচির দিক থেকে একটি প্রবেশপথ রয়েছে এবং দুর্গের অপর প্রান্তে আরো একটি প্রবেশপথ রয়েছে বুধলা মাচির দিক থেকে। ফলে এতে একাধিক প্রবেশপথ রয়েছে।

তারপর তিনি অনুরূপভাবে স্থাপত্যের গঠন পাল্টালেন, তিনি রায়গড়ের মত দ্বি-স্তরীয় দেওয়ালবিশিষ্ট দুর্গ তৈরি করালেন। তিনি শুধুমাত্র এটা নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হলেন না যে দুর্গে যেন যথেষ্ট পরিমাণে শস্য মজুত থাকে, তিনি দেখলেন যাতে দুর্গটি স্বনির্ভর হতে পারে, যাতে সত্যিই দুর্গের ভেতরেই ফসল ফলানো সম্ভব হয়। যথেষ্ট পরিমাণে জলের ব্যবস্থাও করলেন। তিনি অনেকগুলি জলাধার তৈরি করালেন এবং বলতে…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

ছত্রপতি শিবাজির করা নানান সংস্কার এবং হিন্দভি স্বরাজের আদর্শটির গঠন

post-image

ছত্রপতি শিবাজি নানান শাসনতান্ত্রিক এবং সামরিক সংস্কারসাধন করেছিলেন, যা ভবিষ্যতে মারাঠাদের শক্ত ভিতে দাঁড় করিয়েছিল। এসবই লেখা আছে রামচন্দ্র পন্ত রচিত ‘আজ্ঞাপত্র’ নামের বইটিতে, আমরা পরে এই ব্যক্তিটির সম্পর্কে আলোচনা করব। তিনি ছত্রপতি শিবাজির শাসনকালে একজন অমাত্য অর্থাৎ কর আধিকারিক ছিলেন। তিনি অষ্ট প্রধানদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন এবং ভবিষ্যতে তিনি মারাঠাদের মধ্যে এবং মারাঠা রাজনীতির ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তবে সেই সময়ে ছত্রপতি শিবাজি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রবর্তন করেন, যেগুলি কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। সবার প্রথমে তিনি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কাজটি করেছিলেন তা হ’ল ওয়াতনদার প্রথার উচ্ছেদ।সেই সময় পর্যন্ত প্রতিটি দুর্গ কারুর না কারুর জায়গীর ছিল। প্রত্যেকটি দুর্গ ছিল পাকাপোক্তভাবে তৈরি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ, এবং প্রত্যেকটি ব্যক্তি, যাদের অধীনে এই দুর্গগুলি থাকত, অর্থাৎ প্রত্যেক দেশমুখ নিজেরাই হয়ে বসেছিল এক একজন রাজা। তিনি এইসব জমির ইজারা নেওয়া সুবিধেভোগীদের উৎখাত করলেন এবং তার বদলে বেতনভোগী সৈন্যদল চালু করলেন। এই…

Read More
অযোধ্যার শ্রীরামমন্দির ইসলামী আক্রমণ মধ্যযুগীয় ইতিহাস সম্ভাষণের অংশবিশেষ হিন্দু মন্দিরগুলির অশুচিকরণ

মুসলিম আক্রমণকারীদের প্রতিমাবিদ্বেষের তত্ত্ব

post-image

তা সত্ত্বেও এইরকম বয়ান, অর্থাৎ তারা যে সত্যিই (মন্দির) ধ্বংস করেছে সেকথা অনেক এস্কিমোই সাম্প্রতিক কয়েক শতাব্দীতে স্বীকার করেছে। এটা কেবলমাত্র বর্তমানেই, অর্থাৎ গত কয়েক দশকেই দেখা যাচ্ছে যে প্রথমে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা এবং তাদের পিছু পিছু এস্কিমোরা এমন দাবী করছে যে মন্দির ধ্বংস করা তো হয়ইনি, এমনকী আদপে কোনো মন্দির ছিলই না। অথচ তার আগে এ ব্যাপারে যে বিজ্ঞানসম্মত ধারণাটি রয়েছে তা নিয়ে এস্কিমোদের কোনো সমস্যা ছিল না, তারা স্বীকার করত যে হ্যাঁ এখানে একটা মন্দির ছিল এবং হ্যাঁ আমরা সেটি ধ্বংস করেছিলাম। এবং কী ঘটেছিল সে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে চাইলে মন্দির ধ্বংস করবার পেছনে যে মতাদর্শটির প্রেরণা কাজ করছে, সেইটি আমাদের বেশ ক’রে খতিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ এস্কিমোদের প্রতিমাবিদ্বেষের তত্ত্বটির কথা বলছি। এস্কিমো হানাদার বাবরকে শ্রীরামের মন্দিরের পূর্বতন রূপটির বিনাশকারী হিসেবে দায়ী করা হয়। এটি ওই মন্দিরের আদিরূপ না-ই হতে পারে, তবে ওই জায়গাটিকে একটি এস্কিমো উপাসনাস্থলের দ্বারা প্রতিস্থাপিত করবার জন্য বাবরকেই দায়ী করা হয়।

এখন ব্যাপার হচ্ছে যে সে…

Read More
ইসলামী আক্রমণ মধ্যযুগীয় ইতিহাস হিন্দু মন্দিরগুলির অশুচিকরণ

মূর্তিপূজার বিরোধীদের পাপ ধুতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী পণ্ডিতরা যেসব যুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করেন

post-image

এখন রিচার্ড ঈটন এমন কথা বলেছেন। তিনি একজন আমেরিকান এবং স্বঘোষিত কমিউনিস্ট অ্যাকাডেমিক এবং তিনি দাবি করেন যে হিন্দুরা যথেচ্ছ মন্দির ধ্বংস করেছে এবং এটাই তাদের চরিত্রগত খুঁত। বাস্তবে তিনি কিছুতেই এমন কোনো উদাহরণ খুঁজে পান না, স্রেফ হাতে গোনা কয়েকটা ঘটনা ছাড়া যেখানে হিন্দুরা মন্দির ধ্বংস করেবি, বরং মন্দিরের প্রতিমাটি অপহরণ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিমাটি নিজের অধিকারে রাখা একটা অহংকারের বিষয় ছিল, কখনো সেটি শিল্প হিসেবে অমূল্য ছিল ইত্যাদি। আর তাই শাসকরা সেটি হাতাতে চাইতেন এবং তাই নিয়ে যুদ্ধ লাগত। শেষমেশ দেখা যেত প্রতিমাটি অপহৃত হয়েছে, যেটা কিনা পরে বিজয়ী রাজার মূল মন্দিরে স্থান পেয়েছে এবং যে মন্দিরে সেই প্রতিমাটি পূর্বে ছিল তার কোনো ক্ষতি করা হয়নি, এবং অবশ্যই যে যুদ্ধে হেরে গেছে সেই রাজা তাঁর মন্দিরে একটি নতুন বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা ক’রে একইভাবে পূজা-অর্চনা চালিয়ে যেতে পারতেন।

ফলে, এই ব্যাপারটা এস্কিমোদের মূর্তিবিদ্বেষের থেকে একেবারে আলাদা ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই অবমাননা করা এবং শেষ অব্দি পরাজিতের ধর্মটিকে উচ্ছেদ করা,…

Read More
%d bloggers like this: