তবে এরই মধ্যে কিছুটা পূর্ব দিকের এলাকায় সমুদ্রযাত্রা-সংক্রান্ত ক্রিয়াকলাপ পুরোদস্তুর ফুলেফেঁপে উঠেছিল যে এলাকাগুলি বর্তমানের ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। এই এলাকাটি গঙ্গার একেবারে পশ্চিম তট, যাকে এখন আমরা হুগলী ব’লে জানি, সেখান থেকে একেবারে সমুদ্র উপকূলের চিল্কা হ্রদ অব্দি বিস্তৃত। সেই সময়ে উপকূলরেখা বরাবর অঞ্চলটি নানান কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল, এবং অতি সম্প্রতি, এমনকি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই একটি প্রায় ১৫০০ বছর পুরনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল খুঁজে পাওয়া গেছে ভুবনেশ্বরের অনতিদূরেই, যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেটি আসলে একটি ছোটো নগর। তবে গোটা উপকূল বরাবর এমন অনেক ছোট ছোট বন্দর রয়েছে। আর ওড়িয়ারা সেই সময় থেকে বড় বড় অভিযানে যেতে শুরু করেছে।

প্রথমে তারা ধীরে ধীরে উপকূলরেখা ধ’রে এগোতে থাকে, তাই এই ওড়িয়া নাবিক ও বণিকদের কেউ কেউ ধীরে ধীরে উপকূল ধ’রে এগোতে এগোতে ৫ম – ৬ষ্ঠ খৃষ্ট পূর্বাব্দে শ্রীলঙ্কায় এসে পৌঁছতে থাকে এবং এটি খুবই উল্লেখযোগ্য কারণ আপনি ভাববেন যে শ্রীলঙ্কায় যারা বসতি স্থাপন করতে শুরু করেছিল তারা নিশ্চয়ই তামিল এবং মালয়ালি, যারা খুব কাছেই থাকে – এবং এরা সত্যিই উত্তরদিকে কিছু জায়গায় গিয়েছিল, তবে যাকে আমরা তথাকথিত সভ্যতা বলি তার প্রথম চিহ্ন এদের হাত ধরেই এসেছিল যারা স্পষ্টই বেশ কিছুটা দূর থেকে আগত।

সেখানে আগে থেকেই কিছু লোক বাস করত, যেমন ভেড্ডা-রা, তবে একটা বড় সংখ্যক মানুষ হঠাৎ ক’রে এখানে আসতে শুরু করে এবং তারা যে শুধু দক্ষিণদিকেই যাচ্ছিল তা নয়, তারা অন্যান্য দিকেও যেতে থাকে, যেমন উপকূল বরাবর বয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে, যে জায়গাটার নাম ক্রা-এর ইস্থমাস। এটা আসলে সেই সরু একফালি ভূখণ্ড যার দ্বারা মালয়েশিয়া থাইল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত। তারা ওখানে যেতে শুরু করে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আরও একটু এগিয়ে থাইল্যান্ডের উপসাগর পেরিয়ে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ ভিয়েতনাম এবং কাম্বোডিয়ার দিকে যাত্রা করতে শুরু করে।

আমাদের হাতে এখন সত্যিই কিছু দলিল রয়েছে, অন্ততঃ মৌখিক ইতিহাস এবং কিছু শিলালিপি এবং প্রাচীন পুরাণ থেকে, যাতে বোঝা যায় যে ঠিক কী চলছিল, এবং প্রকৃতপক্ষে শ্রীলঙ্কার সিংহলীদের আদি পত্তনের পুরাণকথায় বলে যে সিংহলীদের গোড়ার ইতিহাস হল রাজা বিজয়ের কাহিনী, যিনি নাকি এক সিংহ এবং এক রাজকুমারীর পৌত্র ছিলেন, তবে এই গল্পটি নিয়ে আমার কিছু সংশয় আছে। তিনি আসলে তাঁর প্রায় চারশো অনুগামীকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। আসলে প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করবার কারণে তাঁর পিতা তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি উপকূল ধ’রে এগোতে এগোতে শ্রীলঙ্কায় এসে উপনীত হন এবং এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে এই জনগোষ্ঠী এরপর এখানে বসত করতে শুরু করে। বর্তমান শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যার বড় অংশই নিজেদের আদি ইতিহাস হিসেবে এই দেশান্তরের কথা ব’লে থাকে। নিশ্চয়ই সেটা অনেকগুলি দেশান্তরের পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে হয়েছে যা পরে ঘটে থাকবে, কিন্তু এরা নিজেদের আদি ইতিহাসটিকে এই বিশেষ দেশান্তরের ঘটনাটির মধ্যে দিয়েই বিবৃত করে। এবং এরা সঙ্গে ক’রে অনেক রকম আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক উপাদান নিয়ে আসে, যেগুলি আজও জীবন্ত।

উদাহরণ হিসেবে সিংহের কথাটাই ধরা যাক। এখন শ্রীলঙ্কার পতাকায় সিংহ রয়েছে, কিন্তু তা এলো কোথা থেকে? এবার আপনি যদি ওড়িশায় যান, এবং সেখানকার কিছু প্রাচীন জনবসতি এলাকায় ঘুরে বেড়ান তাহলে যেটা আপনার খুব ক’রে চোখে পড়বে তা হ’ল অনেকগুলি জায়গাতেই নৃসিংহের মন্দির রয়েছে, যেটা অন্ধ্রেও দেখা যায়। এমনকী পুরীতেও, পুরনো মন্দিরটি জগন্নাথের নয়, বরং নৃসিংহের। এবং আজো যখন ভোগ দেওয়া হয়, তখন তা প্রথমে জগন্নাথের কাছে না নিয়ে গিয়ে আসলে প্রথমে নৃসিংহের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

ফলে নৃসিংহের পুজো, অথবা সিংহের প্রতি এক রকম ভক্তি স্পষ্টতই ঐ এলাকার সংস্কৃতির জন্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত, যেটা খুবই অদ্ভুত, কারণ জায়গাটিতে এখন কেবল বাঘই দেখতে পাওয়া যায়। তবে ঘটনাচক্রে এটাও সত্যি যে এই ব্যাপারটার চিহ্ন বঙ্গেও রয়েছে, এবং সেটিও বাঘের এলাকা, তবে সেখানে আজো সিংহের প্রতি ভক্তি দেখা যায় কারণ দুর্গার বাহন সিংহ। ফলে আমি ব্যাখ্যা করতে অপারগ যে এমনটা কেন হয়েছে, হয়তো অতিপরিচিত হ’লে টান কমে যায়, ফলে তারা হয়তো বাঘ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি অথবা হয়তো ওখানকার জলবায়ু তখন আলাদা ছিল এবং ফলতঃ ওখানে অনেক সিংহ ছিল সেসময়, আমার জানা নেই। তবে যেটা ঘটনা তা হ’ল ওখানকার প্রতীকচিহ্ন, মূর্তি ইত্যাদিতে প্রচুর সিংহ রয়েছে এবং তা স্থানান্তরিত হয়ে আজ অব্দি শ্রীলঙ্কার পতাকায় টিঁকে আছে।