এক শতাব্দী বাদে, যখন হঠাৎ ক’রে খুব বড় বড় জাহাজ তৈরি হতে লাগলো, এটা ঘটছিল চতুর্দশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, ঝেং হে নামের একজন নপুংসক চীনা সেনাপতির হাত ধ’রে, এবং তিনি এইসব সুবিশাল জাহাজগুলি নিয়ে এলেন, এই জাহাজগুলি ছিল সত্যিই বিশাল, মানে আমি বলতে চাইছি যে এগুলি ছিল আধুনিক, অর্থাৎ আধুনিক মানের। এই বিশাল বাণিজ্যতরীগুলির নৌবহর, যা চতুর্দশ শতাব্দীতে দেখা গিয়েছিল, এগুলি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে ভারতের দিকে পাড়ি দিয়েছিল, সেখান থেকে আফ্রিকার দিকে গিয়েছিল, এবং এদের মধ্যে একটি নৌবহর সেই ঝেং হে নামক সেনাপতির নেতৃত্বে – যিনি ঘটনাচক্রে একজন নপুংসক ছিলেন – পাড়ি জমিয়েছিল এবং এই যাত্রাগুলি নতুন জলপথ আবিষ্কার করবার উদ্দেশ্যে মোটেই করা হয়নি, কারণ আমি যে জলপথগুলির কথা বলছিলাম তাদের মধ্যে অনেকগুলিই ততদিনে বেশ সুপরিচিত, সেকথা আমি আগেই বলেছি।

এরা যেটা করবার চেষ্টা করছিল তা হ’ল দেখিয়ে দেওয়া যে আসলে কে মাতব্বর এবং তাই চীনেরা দুনিয়ার এই অংশে এলো এবং তারা আসলে নিজেদের বিশাল বাণিজ্যতরী নৌবহর এইসব দেখিয়ে স্থানীয়দের মনে বিস্ময়মাখানো ভয় উদ্রেক করতে চাইছিল। কিন্তু এরা খুব শিগগিরই এইসব এলাকার রাজনীতিতে নাক গলাতে আরম্ভ করল, ফলতঃ শ্রীলঙ্কার রাজসিংহাসনের একজন দাবিদারকে এরা পাকড়াও ক’রে নিয়ে গিয়েছিল এবং তারপর তাকে আবার ফিরিয়ে এনে সিংহাসনে বসানোর চেষ্টা করেছিল, তারা কেরালার জামোরিন অথবা সামুদিরিদের প্রভাবিত করেছিল অথবা করবার চেষ্টা করেছিল, কালিকটেও এরা এক চেষ্টা করেছিল, আসল  শব্দটি হ’ল কোঝিকোড় অথবা আসল উচ্চারণটি হয়তো তা নয় ব’লেই আমার মনে হয়। ফলে তারা হয়তো সেখানে নাক গলিয়ে থেকে থাকবে, অর্থাৎ তারা নিজেদের পেশীশক্তি ব্যবহার ক’রে বিভিন্ন জায়গার রাজনীতিতে নাক গলাচ্ছিল, তবে তাদের এইসব কাজকর্মের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল সম্ভবতঃ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে, এবং তার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলামীকরণ, আমি আপনাদের এখন দেখাবো যে এই ব্যাপারটা আসলে চীনাদের কীর্তি।

এখন মনে ক’রে দেখুন যে দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর ভারতের হিন্দুরা ভারতের বাইরের বাণিজ্যব্যবস্থায় ক্রমেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল, কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হিন্দুরা, বিশেষ ক’রে জাভার হিন্দুরা ভীষণ ভীষণ সক্রিয় ছিল। এমনকী আপনারা দেখতে পাবেন যে আসলে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতেই জাভায় অবস্থিত মজপহিত সাম্রাজ্যের প্রচণ্ড বিস্তার ঘটছে এবং এরা আসলে বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার অধিকাংশ এলাকা এবং এমনকী মালয়েশিয়ার বেশ কিছু অংশ দখল ক’রে নিয়েছিল। ঝেং হে যখন ঐসব দুঃসাহসী অভিযানগুলি করছেন, তখন এরাই একমাত্র গোটা কর্মকাণ্ডটি খুব সন্দেহের চোখে দেখছিল এবং সত্যি বলতে কি, বেশ কয়েকবার এরা চীনের কয়েকজন অভিযাত্রীকে বন্দী ক’রে তাদের মুণ্ডু কেটে দিয়েছিল শুধুমাত্র চীনাদের সাবধান করবার জন্য। চীনারা ব্যাপারটা ভালভাবে নেয়নি, তারা উল্টে মালয়েশিয়ায় স্থিত মালাক্কা নামের অন্য একটি শক্তির কেন্দ্রকে উৎসাহ দিতে শুরু করে, যা কিনা সিঙ্গাপুরের ঠিক উত্তরদিকে অবস্থিত। এদের পরমেশ্বর নামে এক রাজা ছিল, যাকে চীনেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে উৎসাহ দেয়, এমনকী পরমেশ্বর চীনের সম্রাটের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে এবং চীনেরা তাকে প্রচুর ধনদৌলত দেয় এবং তার ফলে চীনের সমর্থন নিয়ে মালাক্কার সাম্রাজ্য ক্রমশঃ খুব শক্তিশালী হ’তে থাকে এবং মজপহিতরা পিছু হটতে শুরু করে। পরের দু’ শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনসংখ্যার ধর্মীয় গঠনবিন্যাসে নাটকীয় রকমের পরিবর্তন দেখা দেয়।