বুধবার, জুলাই 8, 2020
Home > জানেন কি > পল্লবরাজ দ্বিতীয় নন্দীবর্মণ ও তাঁর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বংশপরিচয়

পল্লবরাজ দ্বিতীয় নন্দীবর্মণ ও তাঁর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বংশপরিচয়

এখন, ভারতীয়দের মধ্যে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে ভারতের প্রভাব চিরকাল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকেই ছড়িয়েছে, এমনটা আসলে সত্যি নয়, ঘটনাটা এরকম মোটেই নয় যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ানরা কেবল বসে থাকত আর ভাবত যে আঃ! ভারতীয়রা এসে গেছে, এবার তাদের থেকে কিছু জ্ঞান আহরণ করা যাক। একেবারেই তা নয়। তারা নিজেদের ভূমিকাটিও পালন করছিল, যেমন ইন্দোনেশিয়ানরা অষ্টম, নবম ও দশম শতাব্দীতে নিজেরা অভিযান করা শুরু করেছিল। এমনকী মাদাগাস্কারে, অর্থাৎ আফ্রিকার তীরবর্তী অঞ্চলের খুব কাছেই, যে মানুষেরা প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল তারা আসলে ইন্দনেশিয়ান। এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় কারণ মানবজাতির উদ্ভব যে স্থানে হয়েছে মাদাগাস্কার ঠিক তার পাশেই অবস্থিত। তবে ঘটনাচক্রে আফ্রিকানরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসতি স্থাপন করেনি, বরং ইন্দোনেশিয়ানরা করেছিল। তবে তারা ভারতীয়দের সাথেও যোগাযোগ বজায় রেখেছিল এবং প্রচুর আদানপ্রদান ঘটছিল। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, যা নিয়ে আমরা এত গর্বিত, তার প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ আংশিকভাবে সুমাত্রার রাজাদের দান থেকে মিলেছিল, সুমাত্রার শ্রীবিজয় রাজাদের থেকে। ফলতঃ বিদেশি অনুদানে চলা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের জন্য নতুন কিছু নয়।

তবে এমনকী ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজাদের মধ্যেও কয়েকজন ইন্দোনেশিয়ান বংশোদ্ভূত হয়ে থাকতে পারেন, এবং অবশ্যই উত্তর-পূর্বে প্রভূত পরিমাণে প্রভাব পড়েছিল যার মধ্যে আমি এখন যাচ্ছিই না কারণ সেটি সমুদ্রযাত্রার প্রভাবের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং অন্য কোনো সময় এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে, তবে এমনকী দক্ষিণ ভারত তথা ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজাদের মধ্যে ছিলেন একজন পল্লব রাজা, যাঁর নাম দ্বিতীয় নন্দীবর্মণ। এখন এই দ্বিতীয় নন্দীবর্মণের গল্প খুবই চিত্তাকর্ষক, কারণ দ্বিতীয় নন্দীবর্মণ তাঁর কাহিনী আমাদের জন্য রেখে গেছেন কাঞ্চীর বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দিরের দেওয়ালে, যেখানে বলা হচ্ছে যে অষ্টম শতকের শুরুর দিকে কোনো এক সময় একজন পল্লবরাজ অকালে মারা যান এবং ফলে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয় কারণ অকালে মারা যাওয়ায় তাঁর কোনো সন্তানাদি ছিল না, ফলে চালুক্যেরা এসে রাজ্য দখল করবার চেষ্টায় ছিল। মাৎস্যন্যায় দেখা দেয়, ফলে একটি জরুরি সভা ডাকা হয় যেখানে সমস্ত সামন্তরাজারা এবং পণ্ডিতেরা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা ঠিক করেন যে তাঁরা পল্লব বংশের অপর একটি শাখাকে খুঁজে বের করবেন যা কিনা বহু বছর আগে কোনো এক দূর দেশে চলে গিয়েছিল।

তো, এক রাজা ছিলেন, যিনি এক শতাব্দী আগের কোনো এক পল্লব রাজার ছোট ভাই, যিনি বিদেশে চলে গিয়েছিলেন, সেখানকার রাজকুমারীকে বিয়ে ক’রে রাজা হয়েছিলেন এবং তাঁর বংশ তখনো টিঁকে থাকতেি পারে। ফলে তাড়াহুড়ো ক’রে পণ্ডিত ব্রাহ্মণদের একটি দল তৈরি করা হ’ল এবং তাঁদের একটি নৌকায় চাপিয়ে মহাবলীপুরম থেকে সেই রাজাকে খুঁজে বের করতে পাঠানো হ’ল এবং তাঁরা এসে উপস্থিত হলেন এই রাজদরবারে এবং তাঁরা রাজার এক ছেলেকে নিয়ে যেতে চাইলেন। তাঁর চার ছেলে ছিল, অর্থাৎ ভীমের এই বংশধরের, এবং প্রথম তিন ছেলে যেতে অসম্মত হ’ল তবে তারপর মাত্র বারো বছর বয়স্ক ছোটছেলে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল এবং এই ছোটছেলেটিই তাঁদের সঙ্গে কাঞ্চীতে এলে তাঁকে দ্বিতীয় নন্দীবর্মণ হিসেবে অভিষিক্ত করা হয় এবং তিনি পরবর্তীকালে একজন খুব শক্তিশালী রাজা হয়ে ওঠেন এবং পল্লবদের অনেকগুলি মন্দির নির্মাণ নন্দীবর্মণেরই কীর্তি।

এখন, কে এই নন্দীবর্মণ এবং তিনি কোথা থেকে এলেন? যদি আপনি এই মন্দিরে যান এবং ঘুরে দেখেন তাহলে ঐ মন্দিরগাত্রে খোদাই করা সমস্ত মুখাবয়বে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করতে পারবেন। এগুলির মধ্যে অনেকগুলি স্পষ্টভাবেই প্রাচ্যদেশীয়, এমনকী চীনা মুখাকৃতিও রয়েছে। হ্যাঁ, কাঞ্চীর বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দিরে (শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তরে)। এখন আমার অনুমান হচ্ছে যে, কোনো উল্লেখ না করে থাকলেও এ ব্যাপারে যথেষ্ট নিদর্শন রয়েছে যে পল্লবরা নাগবংশীয় নারীদের বিয়ে করে তাঁদের রক্তের উত্তরাধিকারী হওয়ার বিষয়ে বেশ গর্বিত ছিলেন। এমনকী তাঁদের বেশ কিছু শিলালেখেও এ ব্যাপারে বলা হয়েছে। তাই যদিও আমরা এটা জানি না যে পল্লবরা নিজেরা কোথা হ’তে এসেছিলেন, তাঁরা যে নাগবংশীয় নারীদের বংশধর হবার ব্যাপারে এত গর্বিত ছিলেন তার থেকে অনুমান করা যায় যে অন্ততঃ মাতৃকুলের দিক থেকে তাঁদের বংশে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রক্ত মিশেছিল এবং এটি একটি চিত্তাকর্ষক ব্যাপার কারণ অবশ্যই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পল্লবদের প্রভূত প্রভাব ছিল। আপনারা জানেন যে এমনকী এখনও অব্দি প্রচলিত সেখানকার অনেকগুলি দেশের লিপির উদ্ভব হয়েছে পল্লব লিপি থেকে, যেমন শ্যামদেশীয় লিপি ইত্যাদি। ফলে খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে তাঁদের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, এমনকী মালয়েশিয়াতে দ্বিতীয় নন্দীবর্মণের ব্যাপারে একটি শিলালেখও রয়েছে, এবং এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যে সেটি যেখানে পাওয়া গেছে সেই জায়গাটির নাম ভুজঙ্গ উপত্যকা, অর্থাৎ নাগেদের উপত্যকা। ফলে আমার অনুমান যে তিনি কাম্বোডিয়া-মালয়েশিয়া অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন এবং তিনি এখানে আসেন অষ্টম শতাব্দীতে, এসে এই রাজত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এটা খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার কারণ আজকের দিনে আমাদের পক্ষে এমনটা কল্পনা করাই দুষ্কর যে দক্ষিণ ভারতের শ্রেষ্ঠতম নৃপতিদের একজন পৃথিবীর ঐ অংশটি থেকে এসেছিলেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this:

Sarayu trust is now on Telegram.
#SangamTalks Updates, Videos and more.