উনিশশো আশির দশক পর্যন্ত অকুস্থলে ঠিক কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে জোরদার মতৈক্য ছিল। এস্কিমোরা, কি ইউরোপীয় পর্যটকেরা, কি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা, কি হিন্দুরা ভাবত যে বাবরি মসজিদ প্রতিস্থাপন করেছিল, জোর করে প্রতিস্থাপন করেছিল, একটি হিন্দু মন্দিরকে। এ ব্যাপারে আঠেরোশো আশিতে একটা মামলা হয়েছিল, যাতে একজন ব্রিটিশ বিচারক চূড়ান্ত রায়দান করেছিলেন এবং তিনিই বলেছিলেন, কারণ তাঁর এজলাসে আর কেউ এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেনি। তিনি বলেছিলেন, “হ্যাঁ, এই এস্কিমোটি বহুদিন পূর্বে এই হিন্দু মন্দিরটি ধ্বংস করেছিল”, তবে তাঁর সঙ্গে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন যে, “যেহেতু ঘটনাটি বহু শতাব্দী পূর্বেকার ঘটনা, তাই এখন এই অবস্থাটি পাল্টানোর ব্যাপারে একটু বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছে।” তাই তিনি ব্যাপারটাকে স্থিতাবস্থায় রেখে দিয়েছিলেন, হয়তো এই কারণে যে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে যদি কোনোভাবে স্থিতাবস্থাটি নষ্ট হয় তাহ’লে প্যান্ডোরার বাক্সটি খুলে যাবে এবং তারপর কী হবে কেউ জানে না। ফলে বুঝতেই পারছেন যে এইরকম সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ যথাসম্ভব কম করবার এই ব্রিটিশ নীতির ফলে বিচারকটি সবকিছুকে যেমন রয়েছে তেমনি রেখে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ ব’লে ধ’রে নিয়েছিলেন।

এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ১৯৮০-এর দশকেও ঠিক এই অবস্থানটিই গ্রহণ করতে পারতেন। তাঁরা সহজেই বলতে পারতেন যে, হ্যাঁ, বোঝাই যাচ্ছে যে এস্কিমোরা চারশো বছর আগে একটু অন্যায় ক’রে ফেলেছিল কিন্তু শুধু সেই কারণেই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পাল্টা একই কাজের পুনরাবৃত্তি করা চলে না। তাঁরা তো তখন এই কথাটাই বলতে পারতেন। অথচ সেই সময়ে তাঁরা তাঁদের ক্ষমতার গরবে এতই মত্ত ছিলেন যে এটুকু ক’রে তাঁরা সন্তুষ্ট হতে পারলেন না, উল্টে তাঁরা একটা আরো প্রতিস্পর্ধী একটি অবস্থান নিয়ে বসলেন, সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সবাই বহু শতাব্দীব্যাপী যে ব্যাপারে সহমত ছিল তাঁরা সেটিকে খারিজ ক’রে সেই সহমতটি নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন। তাঁরা বললেন, “না, এখানে কোনোকালে কোনো মন্দির ছিল না, অতএব মন্দির ধ্বংসের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।” ফলে তার আগে অব্দিও, যেমন ওই ব্রিটিশ বিচারকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রশ্নটা ছিল, হিন্দুরা কি তাদের মন্দির ওই স্থানে পুনর্নির্মাণ করতে পারবে? এখন প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়াল – “এ জায়গাটা কি আদৌ কখনো হিন্দুদের ছিল?”

এখন যদি এর বিপক্ষের প্রমাণাদি দেখা যায়, যাদের পরিমাণ সেই সময়ের পর থেকে আরো কিছুটা বেড়েছে, এবং যা এর আগে আরো বেশি পরিমাণে মজুত ছিল, সেইসব বিপক্ষের প্রমাণাদির সাপেক্ষে এবং ওদের কাছে কোনরকম প্রমাণের অভাবের দিকে দৃষ্টি রেখে এটা বলাই যায় যে, এমনটা দাবি করা তাদের পক্ষে একটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার ছিল যে ওই স্থানটি হিন্দুদের জন্য পবিত্র নয়, বিশেষ ক’রে যখন হিন্দুরা বরাবর দাবি ক’রে এসেছে যে ওই স্থানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ছিল। ফলে এই ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের দাবির সত্যিই কোনো ভিত্তি ছিল না। তা সত্ত্বেও এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এমন কোনো ইতিহাস অথবা বিশেষজ্ঞ থেকে থাকতে পারে যা এদের কড়া সমালোচনা করবে, যা তাদের স্বর্গলোক থেকে নির্ধারিত শাস্তি দেবে, তবে এমন কিছুই ঘটেনি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পশ্চিমে, যাকে এরা এ ব্যাপারে শেষ কথা হিসেবে মানে, এমন কোনো ঐতিহাসিক মতবাদ নেই যা নিজে থেকে নাক গলিয়ে বলবে যে না না, তোমরা ভুল করছ, ওখানে অবশ্যই কোনো মন্দির ছিল। অথচ ওই স্থানটির ইতিহাস সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি বই রয়েছে, যেমন পিটার ভ্যান ডার ভীর-এর এবং (শ্রোতাদের জিজ্ঞেস ক’রে) হান্স ব্যাকার-এর বইগুলি। তো হান্স ব্যাকার এবং পিটার ভ্যান ডার ভীর দুজনেই আলাদা আলাদা বইতে আলাদা ক’রে ওই স্থানটির হিন্দু ইতিহাস নথিবদ্ধ করেছেন। অথচ তাঁরা দুজনেই হঠাৎ ক’রে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এলেন এবং অবশ্যই তাঁরা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের উপর কোনো চাপই দিলেন না যাতে ক’রে তারা তাদের রাতারাতি নিশ্চিত অবস্থান যেন পুনর্বিবেচনা করে। ফলে তাদের সমালোচনা করবার কেউই ছিল না, আর তাই তারা যা ইচ্ছে তাই করে পার পেয়ে যাচ্ছিল।

এখন এটা ছিল একটা বেশ সুবিধেজনক অবস্থান, সত্যিটা না বললেও যারা অসত্য বলছিল তারা পার পেয়ে যাচ্ছিল আর অন্যদিকে যারা অযোধ্যার ব্যাপারে সত্যি কথা বলছিল তারা সত্যি বলার জন্যেই শাস্তি পাচ্ছিল। আবার, বর্তমানে স্থানটির প্রতি হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগের কথা মাথায় রাখলে, ওই অবস্থানটিকে হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষ থেকে উৎপন্ন অত্যন্ত বর্বরোচিত একটি দাবি বলেই মনে হয়, কারণ অন্য কোনো ধর্মের উদ্দেশ্যে এমন প্রশ্ন করা হয় না যে, ওহে! প্রমাণ করো, যুক্তি দেখাও যে কীভাবে টেম্পল মাউন্ট পবিত্র ব’লে গণ্য হ’ল, যুক্তি দেখাও কেন ভ্যাটিকান তোমার কাছে একটি পবিত্র স্থান, এমনটা কখনো জিজ্ঞাসা করা হয় না, একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের এমন প্রশ্ন তোলবার কোনো প্রয়োজনই নেই।