শনিবার, জুলাই 21, 2018
Home > ভারতীয় বীরগণ > ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ > ছত্রপতি শিবাজির করা নানান সংস্কার এবং হিন্দভি স্বরাজের আদর্শটির গঠন

ছত্রপতি শিবাজির করা নানান সংস্কার এবং হিন্দভি স্বরাজের আদর্শটির গঠন

ছত্রপতি শিবাজি নানান শাসনতান্ত্রিক এবং সামরিক সংস্কারসাধন করেছিলেন, যা ভবিষ্যতে মারাঠাদের শক্ত ভিতে দাঁড় করিয়েছিল। এসবই লেখা আছে রামচন্দ্র পন্ত রচিত ‘আজ্ঞাপত্র’ নামের বইটিতে, আমরা পরে এই ব্যক্তিটির সম্পর্কে আলোচনা করব। তিনি ছত্রপতি শিবাজির শাসনকালে একজন অমাত্য অর্থাৎ কর আধিকারিক ছিলেন। তিনি অষ্ট প্রধানদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন এবং ভবিষ্যতে তিনি মারাঠাদের মধ্যে এবং মারাঠা রাজনীতির ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তবে সেই সময়ে ছত্রপতি শিবাজি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রবর্তন করেন, যেগুলি কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। সবার প্রথমে তিনি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কাজটি করেছিলেন তা হ’ল ওয়াতনদার প্রথার উচ্ছেদ।সেই সময় পর্যন্ত প্রতিটি দুর্গ কারুর না কারুর জায়গীর ছিল। প্রত্যেকটি দুর্গ ছিল পাকাপোক্তভাবে তৈরি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ, এবং প্রত্যেকটি ব্যক্তি, যাদের অধীনে এই দুর্গগুলি থাকত, অর্থাৎ প্রত্যেক দেশমুখ নিজেরাই হয়ে বসেছিল এক একজন রাজা। তিনি এইসব জমির ইজারা নেওয়া সুবিধেভোগীদের উৎখাত করলেন এবং তার বদলে বেতনভোগী সৈন্যদল চালু করলেন। এই সৈন্যদলকে তিনি যে হারে বেতন দিতেন তা সেকালে ভারতেবর্ষের সর্বোচ্চ বেতনের হার ছিল। সেনানায়কেরা সর্বদা অসামরিক আধিকারিকদের চেয়ে বেশি মাইনে পেতেন। এর ফলে তিনি এইসব বিভিন্ন শ্রেণির লোকেদের, বিশেষ ক’রে এইসব ওয়াতনদারদের তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে শামিল করতে পেরেছিলেন এবং একটি বেতনভোগী সৈন্যবাহিনী তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন যা তাঁকে তাঁর সমকালের চেয়ে অন্ততঃ দেড়শো-দুশো বছর এগিয়ে রাখে।

আমরা এর মধ্যে এও দেখতে পাই যে ছত্রপতি শিবাজি সেকালে যেব্যবস্থা প্রচলিত ছিল মধ্যে একটি গলদ ধরতে পেরেছিলেন, সেই প্রচলিত ব্যবস্থাটি ছিল মুঘলদের চালু করা মনসবদারি প্রথা। প্রথাটি জাঁকিয়ে বসেছিল, আর খুব রমরমিয়েচলছিল। এর প্রভাব ছিল যেকোনো সাম্রাজ্যের মতোই বিস্তৃত, কাশ্মীর থেকে শুরু ক’রে একেবারে কল্যাণ এবং নর্মদা নদীর তট পর্যন্ত। তবে ছত্রপতি শিবাজি ধরতে পেরেছিলেন যে এই ব্যবস্থাটির মধ্যে একটা গলদ রয়েছে। সেটি হ’ল – এই প্রথাকে কায়েম রাখতে হ’লে একটি লৌহদৃঢ় কেন্দ্রীয় শক্তি থাকা দরকার যিনি সমস্ত মনসবদারকে নিজের বশে রাখতে পারবেন, তার উপর এই ব্যবস্থাটি ছিল এইরকমঃ কে কাকে টপকে যেতে পারে, প্রত্যেক মনসবদার উচ্চপদ লাভ করতে চাইত, এছাড়া তাদের আর কোনো অনুপ্রেরণা ছিলই না। যে ব্যক্তির কাছে পাঁচশোর মনসবদারি ছিল, সে কোনো একটা যুদ্ধে গেলে তার বদলে একহাজারি মনসবদারি পেতে চাইত। এমন কোনো প্রণোদনা ছিল না যার জন্যেমুঘল পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কেউ লড়বে, মুঘল সাম্রাজ্যের জন্যে লড়বার মানসিকতা কারুর ছিল না, এই ব্যবস্থাটি কেবলমাত্র নিজেদের ফায়দার জন্য লড়তে লোককে অনুপ্রাণিত করত, যাতে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কেবল নিজেদের সাম্রাজ্যের জন্য যথেষ্ট অর্থ ও লোকবল সংগ্রহ করতেই আগ্রহী থাকত, নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যেই সচেষ্ট থাকত।

তাই শিবাজি এই গলদটি ধরতে পারলেন এবং সেই থেকে তিনি প্রথমেওয়াতনদারি প্রথার উচ্ছেদ ঘটালেন এবং দ্বিতীয়তঃ তিনি হিন্দভি স্বরাজ্যের ধারণাটির গোড়াপত্তন করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে আমরা একটি আদর্শের জন্য লড়ব, এটি সেইসব সময়ের তুলনায় ছিল একেবারে আলাদা যখন লোকে কেবল রাজার জন্যই শুধু যুদ্ধে যেত। সেই রাজা মারা গেলে লড়াইয়ের দু’পক্ষের অবস্থান একশো আশি ডিগ্রি পাল্টে যেত, ঠিক যেমনটা হয়েছিল পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের সময়। একটা ছুটকো বাণ এসে হেমচন্দ্রের বুকে বিঁধল, তিনি তাঁর হাতির পিঠ থেকে প’ড়ে গেলেন আর গোটা যুদ্ধক্ষেত্রে সকলে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড় লাগালো। কেন? কারণ সেখানে আদর্শের কোনো স্থান ছিল না, পুরোটাই “জোর যার মুলুক তার” এই হিসেব মেনে চলত। ফলে, যে মুহূর্তে হেমচন্দ্রের হাত থেকে এই “জোর” অন্তর্হিত হ’ল সেই মুহূর্তে যুদ্ধেও ইতি ঘটলো।

ছত্রপতি শিবাজি এই মনোভাবের রাশ টেনে ধরেছিলেন স্বরাজ্যের আদর্শটিকে প্রবর্তন ক’রে, যাতে বলা হ’ল যে তুমি একটি বিশেষ আদর্শের জন্যে লড়ছ, একটি বিশেষ পতাকার তলে সমবেত হয়ে লড়ছ, এবং এই সাম্রাজ্যের মূলে কোনো ক্ষুদ্র “আমি” নেই, এই স্বরাজ্য হ’ল স্বয়ং শ্রীভগবানের ইচ্ছা, এটি আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়, এমনকী এই স্বরাজ্য ছত্রপতি শিবাজিরও নয়, যার প্রতিষ্ঠার জন্য তুমি লড়ছ তা হ’ল ঈশ্বরের বিধান এবং এই আদর্শটিই সেই সময় থেকেশুরু ক’রে সাতাশ বছর ধ’রেপ্রেরণার স্রোতরূপে দণ্ডায়মান ছিল। তো, এই হ’ল সেইসব কীর্তি যা তিনি ইহকালে রেখে গেছেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: