মুঘল আগ্রাসনের আসন্ন বিপদ এড়াতে ছত্রপতি শিবাজি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন

এবার আমরা আসি দুর্গগুলির কথায়, আমি আগেই বলেছি কীভাবে দেবগিরির দুর্গটির জন্য যুদ্ধ হয়েছিল এবং সে যুদ্ধে পরাজয় ঘটেছিল। এবং শিবাজি যা করেছিলেন তা হ’ল – তিনি দুর্গ তৈরি করবার প্রণালীতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। তিনি একাধিক প্রবেশ এবং নিষ্ক্রমণের পথ তৈরি করিয়েছিলেন। আপনি যদি মহারাষ্ট্রে যান, তাহলে দেখতে পাবেন যে প্রত্যেকটি দুর্গের একাধিক প্রবেশ এবং নির্গমন পথ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এই হ’ল তোরনার দুর্গ, এখানে জুঞ্জার মাচির দিক থেকে একটি প্রবেশপথ রয়েছে এবং দুর্গের অপর প্রান্তে আরো একটি প্রবেশপথ রয়েছে বুধলা মাচির দিক থেকে। ফলে এতে একাধিক প্রবেশপথ রয়েছে।

তারপর তিনি অনুরূপভাবে স্থাপত্যের গঠন পাল্টালেন, তিনি রায়গড়ের মত দ্বি-স্তরীয় দেওয়ালবিশিষ্ট দুর্গ তৈরি করালেন। তিনি শুধুমাত্র এটা নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হলেন না যে দুর্গে যেন যথেষ্ট পরিমাণে শস্য মজুত থাকে, তিনি দেখলেন যাতে দুর্গটি স্বনির্ভর হতে পারে, যাতে সত্যিই দুর্গের ভেতরেই ফসল ফলানো সম্ভব হয়। যথেষ্ট পরিমাণে জলের ব্যবস্থাও করলেন। তিনি অনেকগুলি জলাধার তৈরি করালেন এবং বলতে গেলে যুদ্ধের জন্য দুর্গগুলি নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠল। উদাহরণস্বরূপ নেওয়া যাক রামসেজের দুর্গটিকে, যা নাসিকের উত্তরে কোনো এক জায়গায় অবস্থিত। এই দুর্গটি খুব একটা বড় নয়, এটি শিবাজির অপেক্ষাকৃত ছোট দুর্গগুলির মধ্যে পড়ে। অথচ ঔরংজেব যখন আক্রমণ করে বসে, তখন এই একটি দুর্গ একা টানা ছ’বছর ধ’রে লড়েছিল। ফলে শিবাজির নীতি–প্রণয়নের দরুন মহারাষ্ট্রের দুর্গগুলিতে এই ধরণের ক্ষমতায়ন সম্ভব হয়েছিল।

তিনি আরেকটি যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিলেন তা হ’ল এইরকম – যখন তিনি ১৬৬৮ সালে মুঘলদের নজর এড়িয়ে পালিয়েছিলেন তখন তিনি জানতেন যে মুঘলরা একদিন হঠাৎ ক’রে দাক্ষিণাত্যে এসে পড়বে। তিনি জানতেন যে ঔরংজেব আসবেই এবং তিনি যা কিছু গড়ে তুলেছেন সেসব গুঁড়িয়ে দেবার চেষ্টা করবেই। এক বছর ধ’রে শিবাজি গড়ে তুলেছিলেন এবং সেকথা মাথায় রেখে ১৬৭০ সালেই, এখানে আমরা বুঝতে পারি যে ছত্রপতি শিবাজি কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন, ১৬৭০ সালেই তিনি আলাদা ক’রে অর্থ রেখে দিয়েছিলেন – দুর্গের মেরামতির জন্য এক লক্ষ পঁচিশ হাজার, প্রশিক্ষণ ও দুর্গের হয়ে লড়বার প্রয়োজনে সৈন্যবাহিনীতে লোক নিযুক্ত করার জন্য এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার, এবং এই অর্থ তিনি বিভিন্ন দুর্গের মধ্যে বণ্টন ক’রে দিয়েছিলেন, সিংহগড়ে পাঁচ হাজার, তোরনাতে দশ হাজার, রায়গড়ে পাঁচ হাজার – এইরকমভাবে বিভিন্ন সব জায়গায় – কারণ তিনি জানতেন যে মুঘল সৈন্য আক্রমণ ক’রে বসলে রায়গড়ের মতোএকটিমাত্র কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে সবটা পরিচালনা করা সম্ভব না-ও হতে পারে। দুর্গগুলির মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন ক’রে দেওয়া হবে এবং সেসময় তাদের পক্ষে প্রত্যেকবার রায়গড়ে এসে অর্থ চাইবার মতো ক্ষমতা কিংবা সময় অথবা অর্থ – কোনোটাই না থাকতে পারে, ফলে এসে সাহায্য চাওয়া এবং তারপর আবার দুর্গে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হতেই পারে। সেরকমটা চেষ্টা করতে গেলেই দুর্গ খুইয়ে বসতে হবে।

তাই তিনি এই অর্থ প্রত্যেকটি দুর্গের মধ্যে ভাগ ক’রে দিয়েছিলেন এবং সে কারণেই তারা দীর্ঘ সময় ধ’রে দুর্গ অবরোধের মুখেও টিঁকে থাকতে পেরেছিল, কারণ তাদের মেরামতি কিংবা লোকনিযুক্তির জন্যে চিন্তা করার দরকার হ’ত না। তিনি আরও যে কাজটি সম্পাদন করেছিলেন তা হ’ল জোড়ায়-জোড়ায় দুর্গ বানানো, যাতে একটি দুর্গের পতন অবশ্যম্ভাবী হ’লে অথবা সেখানে সামগ্রীর অভাব দেখা দিলে পাশে অবস্থিত দুর্গটি থেকে সহজেই প্রয়োজনীয় সাহায্য পাওয়া যায়, এইজন্যে আমরা জোড়ায় জোড়ায় দুর্গ দেখতে পাই। দেখতে পাবেন যেপুরন্দরগড় এবং বজ্রগড় পাশাপাশি অবস্থিত, দেখবেন রাজগড় এবং তোরনা পাশাপাশি অবস্থান করছে, আবার রামসেজ নামের দুর্গটি ত্রিম্বক দুর্গের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। আসলে ত্রিম্বক দুর্গ থেকেই রামসেজে প্রয়োজনীয় সাহায্য পাঠানো হ’ত এবং সেই কারণেই এটি একটানা ছ’বছর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পেরেছিল। তো এই ছিল তখনকার পরিস্থিতি, এবংএই ছিল শিবাজির গড়ে তোলা সাম্রাজ্যের স্বরূপ।

You may also like...

Leave a Reply

%d bloggers like this: