রবিবার, নভেম্বর 18, 2018
Home > ইসলামী আক্রমণ > ঔরংজেবের শেষ অভিযান এবং তার চূড়ান্ত পরাজয়

ঔরংজেবের শেষ অভিযান এবং তার চূড়ান্ত পরাজয়

 

তো সেই সময়ে ঔরংজেব ঠিক করল যে আমি শেষ অভিযানে বেরবো,সমস্ত দুর্গ দখল করবো এবং পশ্চিম মহারাষ্ট্রে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করবো। আর এর ফলে, ১৭০০ সালে, ৮৫ বছর বয়সে ঔরংজেব তার জীবনের সর্বশেষ অভিযানে বেরোল। ধ’রে নেওয়া হয়েছিল যে সেটি মুঘলদের জন্যে একটি সহজ অভিযান হতে চলেছে, যে অভিযানে তারা সমস্ত দুর্গ দখল ক’রে নেবে এবং যেহেতু ক্ষমতা রয়েছে একটি ২৫ বছর বয়স্ক নারীর হাতে, তাই মারাঠাদের দিক থেকে কিছুই করা হবে না। এর চেয়ে বড় ভুল সে হয়তো আর করেনি, কারণ সে যুদ্ধ করত,সে একটা ক’রে দুর্গে যেত, যুদ্ধ করতেই থাকত, করতেই থাকত, আর ওদিকে মহারাণী তারাবাই স্বয়ং সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। যাঁরা কেল্লার হয়ে যুদ্ধ করছিলেন, তাঁদের অনেক চিঠি পাঠানো হ’ত এই ব’লে যে তাঁরা মুঘলদের দূর করবার কাজটা বেশ ভালভাবেই সামলাচ্ছেন। এই স্থানগুলিতে মোটামুটি বছরখানেক ধ’রে যুদ্ধ চলত, শেষমেশ তাঁরা আগেকার নীতি অনুসরণ ক’রে দুর্গ বেচে দিতেন, মুঘলদের এইসব দুর্গ বেচা হ’ত চড়া দামে কারণ ঔরংজেব মরণপণ ক’রেছিল যে যেভাবেই হোক দুর্গগুলি সে দখল করবেই, তা সে টাকার বিনিময়েই হোক না কেন।সেই অর্থে এটা ছিল ঔরংজেবের জীবনের শেষ কেনাকাটার ফর্দ।

সে বিশালগড়ে ২ লাখ টাকা দিয়েছিল, সিংহগড়ের জন্য দিয়েছিল ৫০০০০, অন্য দুর্গগুলির জন্য দিয়েছিল ৭০০০০, এটা এমন এক সময় যখন একজন সাধারণ সৈনিকের মাসোহারা ছিল তিন কি চার টাকা। তখন ৫০০০০ মানে অনেক টাকা, তা দিয়ে তারা দুর্গ পুনর্দখলের জন্য একটা আস্ত সৈন্যদল খাড়া করতে পারত, এবং তারা সেটাই করেছিল। এমনকী রাজগড়ে মুঘলেরা ঐ এলাকার বাইরের সীমানা বরাবর বেশ কিছু অঞ্চল দখল করতে পেরেছিল, তবে বালেকিল্লা, যেটি ছিল মূল দুর্গ, সেখান থেকে আরও ১৫ দিন ধ’রে লড়াই চালিয়ে যাওয়া হয়। এবং ধীরে ধীরে অথচ নিশ্চিতভাবে বিশাল টাকার অঙ্কের বিনিময়ে সে সমস্ত দুর্গের দখল নিতে পেরেছিল, শুধু তোরনা ছাড়া। একমাত্রতোরনাই হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে ঔরংজেবের সৈন্যদলের মারাঠা সর্দারেরা দড়ির মই লাগিয়ে দুর্গে চড়তে সক্ষম হয়েছিল, ঠিক যেমন ভাবে ছত্রপতি শিবাজির সৈনিকেরা করত, এবং দুর্গের দখল নিয়েছিল। অন্য সব জায়গা কিনতে হয়েছিল বিশাল বিশাল টাকার অঙ্কের বিনিময়ে এবং তাই এই সময়কাল চিহ্নিত ক’রে রেখেছে (সমস্ত) বিভিন্ন দুর্গে অবরোধ করা এবং দখল করার দিনগুলি।

১৭০৩ সালে ধানাজি যাদব, যখন ঔরংজেব এইসব দুর্গগুলি দখল করতে ব্যস্ত ছিল, তখন তিনি উত্তরদিকে গুজরাটে গিয়েছিলেন, সেখানে রতনপুর নামে একটি জায়গায় এক বিশাল মুঘল সৈন্যদলের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। অথচ তিনি তাঁদের রীতিমতো নাকাল ক’রে পর্যুদস্ত করেছিলেন। গুজরাটে মুঘল সেনাদের এই পরাজয়ের ফলে মুঘল শক্তি গুজরাট থেকে একরকম চিরতরে মুছেই গিয়েছিল, কারণ এরপরে খান্ডেরাও দাভাড়ে নিজেকে পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। গুজরাটে মুঘলদের এই পরাজয় এতই নিদারুণ ছিল যে এর ফলে রাজপুতানা এবং মালওয়াতে লোকে এর থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করল, এবং মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করল। শেষ পর্যন্ত ঔরংজেব পশ্চিম মহারাষ্ট্র থেকে পিছু হটল এবং ওয়াকিঙ্খেরানামের একটি জায়গায় গেল, যা উত্তর কর্ণাটকে অবস্থিত, যা অনেকটা এই জায়গাটার কাছাকাছি অবস্থিত।

বেরাদরা আসলে ছিল নিশানাবাজ এবং রাইফেলধারী, ধানাজি যাদব এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন এবং এর ফলে অবরোধ তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, যে সময়ে অবরোধ চলছিল, যেগুলি মারাঠারা ভঙ্গ করেছিলেন, এই সমস্ত দুর্গ যেগুলি দখল হয়ে গিয়েছিল, এই সমস্ত দুর্গ যেগুলি ঔরংজেব দখল করে নিয়েছিল সেগুলি মারাঠারা পুনরায় অধিকার করেন মহারাণী তারাবাইয়ের নেতৃত্বে। তাই, ১৭০৫ সালের মধ্যে, ঔরংজেব এমন একটা জায়গায় চলে গিয়েছিল যেখানে সে প্রায় সমস্তই খুইয়ে বসেছে, এমনকী তার শেষ অভিযান চলাকালীন সে যা কিছু দখল করেছিল সে সমস্তও। সে আহমেদনগরে ফিরে যায়, আহমেদনগরে ঔরংজেব ফিরে যায়, দাক্ষিণাত্যে সে যাবৎ যা কিছু সে জয় করেছিল সে সমস্তই হারিয়ে ফেলেছিল।

উত্তর ভারতে বিদ্রোহ চলছিল, কোনো রাজপুত আর মুঘলদের সঙ্গে রইল না। সমস্ত মুঘল সর্দার, যারা কিনা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণীর সর্দার ছিল তারা তখন খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, কারণ তাদের নিজেদের প্রদেশগুলি বহু দীর্ঘ সময়ব্যাপী শাসন করা ছাড়া তাদের অন্য কিছুই করনীয় ছিল না এবং ঔরংজেবের কাছে আর সেই সামরিক শক্তি অথবা সম্পদ ছিল না যে সে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। ঔরংজেব যা করছিল তা হচ্ছে, যখন সে এইসব জায়গাগুলো দখল করত তখন প্রথমে সে সেখানকার নাম বদলে দিত, আপনি দেখতে পাবেন যে সে সবরকম ফারসি এবং আরবি নাম চাপিয়েছিল যেগুলির নানান অর্থ রয়েছে, যেমনটা সে করেছিল ব্রহ্মপুরীতে। ব্রহ্মপুরীতে ঔরংজেবেরশিবির ফেলে রাখা হয়েছিল প্রায় ৪ বছর ধ’রে, খুব দায়িত্বশীলভাবে সে জায়গাটির নামকরণ সে করেছিল ইসলামপুরী। এই চার বছর ধ’রে সে আরও একটি কাজ করেছিল, তার নিজের সৈন্য ধ্বংস হচ্ছিল, তার সম্পদ নষ্ট হচ্ছিল,তার সমস্ত সর্দারেরা পরাজিত হচ্ছিল, তবুও সে জেজুরির খান্ডোবা মন্দির আক্রমণ করবার সময় বের করে নিয়েছিল, সেটা ১৭০২ সাল এবংদক্ষিণ ভারতে তার অধীনস্থ যা কিছু অঞ্চল ছিল সেখানে সে জিজিয়া কর চাপিয়েছিল।

তাই এই সমস্ত জায়গায়, যদি সে আরও কিছুদিন এগুলির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পারত তাহলে তাদের নাম বদলে যেত, যেমনটা হয়েছিল আজিম তারায়, ইসলামপুরীতে, রহমানবক্‌শ এবং আরো সব জায়গায়। সিংহগড়ের নাম বদলে রাখা হয়েছিল বখশিন্দাবক্‌শ, যার অর্থ হল ঈশ্বরের উপহার, অর্থাৎ বখশিন্দাবক্‌শ, তবে মারাঠারা এইসব দুর্গ পুনর্বার অধিকার করবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাদের পুরনো নাম ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তো, মুঘল সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতোভেঙে পড়ছিল এবং তার শিবির ফেলা হয়েছিল আহমেদনগরে।

এই সময় নাগাদ একটা বেশ উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। এ হ’ল সেই ঔরংজেব যে প্রায় ২০ বছর আগেও ৫ লাখ সৈন্যবিশিষ্ট বিশাল মুঘল সেনাড় নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সে যখন দেখল যে ধানাজি যাদব ও নেমাজি শিন্দে এবং আরো কয়েকজন আহমেদনগরে তার শিবির আক্রমণ করতে আসছে তখন সে যা করেছিল তা হচ্ছে এইরকম – সে নিজের তাবিজটি বের ক’রে কোরানের বাণী আউড়ে তার সেনাপতিকে দিয়ে বলেছিল–তুমি এটা রাখো, এটা তোমায় মারাঠাদের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করবে। মুঘল সম্রাটের পক্ষে এরচেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব ছিল না। ১৭০৬ সালে তার শিবিরে আক্রমণ হানা হ’ল, অথচ ধানাজি যাদব এবং নেমাজি শিন্দে মুঘল সাম্রাজ্যকে, আমি বলতে চাইছি মুঘল সম্রাটকে ছেড়ে দিলেন। কেন? কারণ সেই সময়ে তাঁরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁরা সহজেই উত্তর গুজরাটে পৌঁছতে পারতেন, মালওয়া, ভোপালেপৌঁছতে পারতেন। ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করা ঢের বেশি লাভজনক ছিল, শুধু অপেক্ষা করতে হ’ত কখন দিল্লী থেকে মহারাষ্ট্রের দিকে ধনসম্পদ আসবে, সেটিকে মাঝপথে লুট ক’রে নিজেদের সেনাবাহিনীর কাজে লাগানোটা অনেক বেশি লাভজনক ছিল। তার বদলে লোকটিকে মেরে ফেললে আবার সেই একই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠত, কারণ তখন এমন একটা সময় চলে এসেছিল যে ঔরংজেবকে বাঁচিয়ে রাখা তাকে মেরে ফেলবার তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক ছিল।

১৭০৭ সালে, এই হ’ল কোলহাপুরে মহারাণী তারাবাইয়ের মূর্তি, ১৭০৭ সালে ঔরংজেব মারা গেল, এমনিতেইকেউ তার যুদ্ধটি চালিয়ে যাবার ব্যাপারে উৎসাহী ছিল না। তার চারটি ছেলে ছিল, তাদের সকলকে দিল্লীতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হ’ল। যুদ্ধে তারা নানান দায়িত্ব নিয়ে জড়িয়ে ছিল, তারা সকলে দিল্লীতে ফিরে গেল।

Leave a Reply

%d bloggers like this: