তো সেই সময়ে ঔরংজেব ঠিক করল যে আমি শেষ অভিযানে বেরবো,সমস্ত দুর্গ দখল করবো এবং পশ্চিম মহারাষ্ট্রে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করবো। আর এর ফলে, ১৭০০ সালে, ৮৫ বছর বয়সে ঔরংজেব তার জীবনের সর্বশেষ অভিযানে বেরোল। ধ’রে নেওয়া হয়েছিল যে সেটি মুঘলদের জন্যে একটি সহজ অভিযান হতে চলেছে, যে অভিযানে তারা সমস্ত দুর্গ দখল ক’রে নেবে এবং যেহেতু ক্ষমতা রয়েছে একটি ২৫ বছর বয়স্ক নারীর হাতে, তাই মারাঠাদের দিক থেকে কিছুই করা হবে না। এর চেয়ে বড় ভুল সে হয়তো আর করেনি, কারণ সে যুদ্ধ করত,সে একটা ক’রে দুর্গে যেত, যুদ্ধ করতেই থাকত, করতেই থাকত, আর ওদিকে মহারাণী তারাবাই স্বয়ং সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। যাঁরা কেল্লার হয়ে যুদ্ধ করছিলেন, তাঁদের অনেক চিঠি পাঠানো হ’ত এই ব’লে যে তাঁরা মুঘলদের দূর করবার কাজটা বেশ ভালভাবেই সামলাচ্ছেন। এই স্থানগুলিতে মোটামুটি বছরখানেক ধ’রে যুদ্ধ চলত, শেষমেশ তাঁরা আগেকার নীতি অনুসরণ ক’রে দুর্গ বেচে দিতেন, মুঘলদের এইসব দুর্গ বেচা হ’ত চড়া দামে কারণ ঔরংজেব মরণপণ ক’রেছিল যে যেভাবেই হোক দুর্গগুলি সে দখল করবেই, তা সে টাকার বিনিময়েই হোক না কেন।সেই অর্থে এটা ছিল ঔরংজেবের জীবনের শেষ কেনাকাটার ফর্দ।

সে বিশালগড়ে ২ লাখ টাকা দিয়েছিল, সিংহগড়ের জন্য দিয়েছিল ৫০০০০, অন্য দুর্গগুলির জন্য দিয়েছিল ৭০০০০, এটা এমন এক সময় যখন একজন সাধারণ সৈনিকের মাসোহারা ছিল তিন কি চার টাকা। তখন ৫০০০০ মানে অনেক টাকা, তা দিয়ে তারা দুর্গ পুনর্দখলের জন্য একটা আস্ত সৈন্যদল খাড়া করতে পারত, এবং তারা সেটাই করেছিল। এমনকী রাজগড়ে মুঘলেরা ঐ এলাকার বাইরের সীমানা বরাবর বেশ কিছু অঞ্চল দখল করতে পেরেছিল, তবে বালেকিল্লা, যেটি ছিল মূল দুর্গ, সেখান থেকে আরও ১৫ দিন ধ’রে লড়াই চালিয়ে যাওয়া হয়। এবং ধীরে ধীরে অথচ নিশ্চিতভাবে বিশাল টাকার অঙ্কের বিনিময়ে সে সমস্ত দুর্গের দখল নিতে পেরেছিল, শুধু তোরনা ছাড়া। একমাত্রতোরনাই হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে ঔরংজেবের সৈন্যদলের মারাঠা সর্দারেরা দড়ির মই লাগিয়ে দুর্গে চড়তে সক্ষম হয়েছিল, ঠিক যেমন ভাবে ছত্রপতি শিবাজির সৈনিকেরা করত, এবং দুর্গের দখল নিয়েছিল। অন্য সব জায়গা কিনতে হয়েছিল বিশাল বিশাল টাকার অঙ্কের বিনিময়ে এবং তাই এই সময়কাল চিহ্নিত ক’রে রেখেছে (সমস্ত) বিভিন্ন দুর্গে অবরোধ করা এবং দখল করার দিনগুলি।

১৭০৩ সালে ধানাজি যাদব, যখন ঔরংজেব এইসব দুর্গগুলি দখল করতে ব্যস্ত ছিল, তখন তিনি উত্তরদিকে গুজরাটে গিয়েছিলেন, সেখানে রতনপুর নামে একটি জায়গায় এক বিশাল মুঘল সৈন্যদলের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। অথচ তিনি তাঁদের রীতিমতো নাকাল ক’রে পর্যুদস্ত করেছিলেন। গুজরাটে মুঘল সেনাদের এই পরাজয়ের ফলে মুঘল শক্তি গুজরাট থেকে একরকম চিরতরে মুছেই গিয়েছিল, কারণ এরপরে খান্ডেরাও দাভাড়ে নিজেকে পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। গুজরাটে মুঘলদের এই পরাজয় এতই নিদারুণ ছিল যে এর ফলে রাজপুতানা এবং মালওয়াতে লোকে এর থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করল, এবং মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করল। শেষ পর্যন্ত ঔরংজেব পশ্চিম মহারাষ্ট্র থেকে পিছু হটল এবং ওয়াকিঙ্খেরানামের একটি জায়গায় গেল, যা উত্তর কর্ণাটকে অবস্থিত, যা অনেকটা এই জায়গাটার কাছাকাছি অবস্থিত।

বেরাদরা আসলে ছিল নিশানাবাজ এবং রাইফেলধারী, ধানাজি যাদব এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন এবং এর ফলে অবরোধ তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, যে সময়ে অবরোধ চলছিল, যেগুলি মারাঠারা ভঙ্গ করেছিলেন, এই সমস্ত দুর্গ যেগুলি দখল হয়ে গিয়েছিল, এই সমস্ত দুর্গ যেগুলি ঔরংজেব দখল করে নিয়েছিল সেগুলি মারাঠারা পুনরায় অধিকার করেন মহারাণী তারাবাইয়ের নেতৃত্বে। তাই, ১৭০৫ সালের মধ্যে, ঔরংজেব এমন একটা জায়গায় চলে গিয়েছিল যেখানে সে প্রায় সমস্তই খুইয়ে বসেছে, এমনকী তার শেষ অভিযান চলাকালীন সে যা কিছু দখল করেছিল সে সমস্তও। সে আহমেদনগরে ফিরে যায়, আহমেদনগরে ঔরংজেব ফিরে যায়, দাক্ষিণাত্যে সে যাবৎ যা কিছু সে জয় করেছিল সে সমস্তই হারিয়ে ফেলেছিল।

উত্তর ভারতে বিদ্রোহ চলছিল, কোনো রাজপুত আর মুঘলদের সঙ্গে রইল না। সমস্ত মুঘল সর্দার, যারা কিনা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণীর সর্দার ছিল তারা তখন খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, কারণ তাদের নিজেদের প্রদেশগুলি বহু দীর্ঘ সময়ব্যাপী শাসন করা ছাড়া তাদের অন্য কিছুই করনীয় ছিল না এবং ঔরংজেবের কাছে আর সেই সামরিক শক্তি অথবা সম্পদ ছিল না যে সে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। ঔরংজেব যা করছিল তা হচ্ছে, যখন সে এইসব জায়গাগুলো দখল করত তখন প্রথমে সে সেখানকার নাম বদলে দিত, আপনি দেখতে পাবেন যে সে সবরকম ফারসি এবং আরবি নাম চাপিয়েছিল যেগুলির নানান অর্থ রয়েছে, যেমনটা সে করেছিল ব্রহ্মপুরীতে। ব্রহ্মপুরীতে ঔরংজেবেরশিবির ফেলে রাখা হয়েছিল প্রায় ৪ বছর ধ’রে, খুব দায়িত্বশীলভাবে সে জায়গাটির নামকরণ সে করেছিল ইসলামপুরী। এই চার বছর ধ’রে সে আরও একটি কাজ করেছিল, তার নিজের সৈন্য ধ্বংস হচ্ছিল, তার সম্পদ নষ্ট হচ্ছিল,তার সমস্ত সর্দারেরা পরাজিত হচ্ছিল, তবুও সে জেজুরির খান্ডোবা মন্দির আক্রমণ করবার সময় বের করে নিয়েছিল, সেটা ১৭০২ সাল এবংদক্ষিণ ভারতে তার অধীনস্থ যা কিছু অঞ্চল ছিল সেখানে সে জিজিয়া কর চাপিয়েছিল।

তাই এই সমস্ত জায়গায়, যদি সে আরও কিছুদিন এগুলির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে পারত তাহলে তাদের নাম বদলে যেত, যেমনটা হয়েছিল আজিম তারায়, ইসলামপুরীতে, রহমানবক্‌শ এবং আরো সব জায়গায়। সিংহগড়ের নাম বদলে রাখা হয়েছিল বখশিন্দাবক্‌শ, যার অর্থ হল ঈশ্বরের উপহার, অর্থাৎ বখশিন্দাবক্‌শ, তবে মারাঠারা এইসব দুর্গ পুনর্বার অধিকার করবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাদের পুরনো নাম ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তো, মুঘল সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতোভেঙে পড়ছিল এবং তার শিবির ফেলা হয়েছিল আহমেদনগরে।

এই সময় নাগাদ একটা বেশ উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। এ হ’ল সেই ঔরংজেব যে প্রায় ২০ বছর আগেও ৫ লাখ সৈন্যবিশিষ্ট বিশাল মুঘল সেনাড় নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সে যখন দেখল যে ধানাজি যাদব ও নেমাজি শিন্দে এবং আরো কয়েকজন আহমেদনগরে তার শিবির আক্রমণ করতে আসছে তখন সে যা করেছিল তা হচ্ছে এইরকম – সে নিজের তাবিজটি বের ক’রে কোরানের বাণী আউড়ে তার সেনাপতিকে দিয়ে বলেছিল–তুমি এটা রাখো, এটা তোমায় মারাঠাদের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করবে। মুঘল সম্রাটের পক্ষে এরচেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব ছিল না। ১৭০৬ সালে তার শিবিরে আক্রমণ হানা হ’ল, অথচ ধানাজি যাদব এবং নেমাজি শিন্দে মুঘল সাম্রাজ্যকে, আমি বলতে চাইছি মুঘল সম্রাটকে ছেড়ে দিলেন। কেন? কারণ সেই সময়ে তাঁরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন যে তাঁরা সহজেই উত্তর গুজরাটে পৌঁছতে পারতেন, মালওয়া, ভোপালেপৌঁছতে পারতেন। ওখানে গিয়ে অপেক্ষা করা ঢের বেশি লাভজনক ছিল, শুধু অপেক্ষা করতে হ’ত কখন দিল্লী থেকে মহারাষ্ট্রের দিকে ধনসম্পদ আসবে, সেটিকে মাঝপথে লুট ক’রে নিজেদের সেনাবাহিনীর কাজে লাগানোটা অনেক বেশি লাভজনক ছিল। তার বদলে লোকটিকে মেরে ফেললে আবার সেই একই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠত, কারণ তখন এমন একটা সময় চলে এসেছিল যে ঔরংজেবকে বাঁচিয়ে রাখা তাকে মেরে ফেলবার তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক ছিল।

১৭০৭ সালে, এই হ’ল কোলহাপুরে মহারাণী তারাবাইয়ের মূর্তি, ১৭০৭ সালে ঔরংজেব মারা গেল, এমনিতেইকেউ তার যুদ্ধটি চালিয়ে যাবার ব্যাপারে উৎসাহী ছিল না। তার চারটি ছেলে ছিল, তাদের সকলকে দিল্লীতে ফেরত নিয়ে যাওয়া হ’ল। যুদ্ধে তারা নানান দায়িত্ব নিয়ে জড়িয়ে ছিল, তারা সকলে দিল্লীতে ফিরে গেল।

Leave a Reply

You may also like

ইসলামী আক্রমণ ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

ঔরংজেবের শেষ অভিযান এবং তার চূড়ান্ত পরাজয়

post-image

 

তো সেই সময়ে ঔরংজেব ঠিক করল যে আমি শেষ অভিযানে বেরবো,সমস্ত দুর্গ দখল করবো এবং পশ্চিম মহারাষ্ট্রে মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা করবো। আর এর ফলে, ১৭০০ সালে, ৮৫ বছর বয়সে ঔরংজেব তার জীবনের সর্বশেষ অভিযানে বেরোল। ধ’রে নেওয়া হয়েছিল যে সেটি মুঘলদের জন্যে একটি সহজ অভিযান হতে চলেছে, যে অভিযানে তারা সমস্ত দুর্গ দখল ক’রে নেবে এবং যেহেতু ক্ষমতা রয়েছে একটি ২৫ বছর বয়স্ক নারীর হাতে, তাই মারাঠাদের দিক থেকে কিছুই করা হবে না। এর চেয়ে বড় ভুল সে হয়তো আর করেনি, কারণ সে যুদ্ধ করত,সে একটা ক’রে দুর্গে যেত, যুদ্ধ করতেই থাকত, করতেই থাকত, আর ওদিকে মহারাণী তারাবাই স্বয়ং সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। যাঁরা কেল্লার হয়ে যুদ্ধ করছিলেন, তাঁদের অনেক চিঠি পাঠানো হ’ত এই ব’লে যে তাঁরা মুঘলদের দূর করবার কাজটা বেশ ভালভাবেই সামলাচ্ছেন। এই স্থানগুলিতে মোটামুটি বছরখানেক ধ’রে যুদ্ধ চলত, শেষমেশ তাঁরা আগেকার নীতি অনুসরণ ক’রে দুর্গ বেচে দিতেন, মুঘলদের এইসব দুর্গ বেচা হ’ত চড়া দামে কারণ…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধের ফলে বহু জায়গায় মুঘলদের পরাজয় ঘটেছিল

post-image

তো এই ছিল ১৬৯০-এর দশকে সংঘটিত যুদ্ধের প্রভাব, যার ফলে মারাঠারা খুবই শক্তিশালীসৈন্যদল গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল। তারা এই একই গেরিলা যুদ্ধনীতির আশ্রয় নিয়েছিল যাতে আঘাত হেনেই দ্রুত পলায়ন করতে হয়, এটি আসলে ছিল দীর্ঘকাল ধ’রে বারবার আক্রমণ হেনে অপর পক্ষকে দুর্বল বানিয়ে ফেলবার যুদ্ধনীতি, এবং বহু জায়গায় এভাবে যুদ্ধ হয়ে থাকে।

এর ফলস্বরূপ মুঘল রাজকোষ একেবারে শূন্য হয়ে পড়েছিল। এই যুদ্ধে তাদের প্রতি বছর প্রায় ১৫০০০ লোকক্ষয় হচ্ছিল। শাহজাহান, জাহাঙ্গীরের সময়কার ধনরত্ন, একেবারে আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের সময়কাল থেকে সঞ্চিত ধনরাশি, লালকেল্লায় রক্ষিত যেসব সিন্দুক কোনোদিন খোলাই হয়নি, সেসবও খোলা হতে লাগল পাওনাদারের অর্থ পরিশোধ করবার জন্য। অনেক জায়গায় মারাঠারা কোনো একজন মুঘল সেনাপতিকে বন্দী ক’রে তার মুক্তিপণ হিসেবে অর্থ চাইত, পেয়ে গেলে তাকে ছেড়ে দিয়ে পিছু হটত। অনেক জায়গায় আবার দুর্গটিকেই বেচে দেওয়া হ’ত, প্রথমে দুর্গরক্ষার জন্যলড়ে যখন দেখা যেত যে লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব, তখন তারা অর্থ দাবী করত, অর্থ আদায় করত, দুর্গটি…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

মারাঠা সেনানায়ক সান্তাজি ঘোরপাড়ে কর্তৃক ঔরংজেবের শিবির আক্রমণ

post-image

সান্তাজি ঘোরপাড়ের নেতৃত্বে একটি অত্যন্ত দুঃসাহসী আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তাও আবার একেবারে ঔরংজেবের নিজের শিবিরে। সেই সময়ে ঔরংজেবের শিবির ফেলা হয়েছিল, কোরেগাঁও অঞ্চলে শিবিরটি ছিল, এই অঞ্চলটি পুণার কাছে অবস্থিত এবং তারা সেখান থেকে চাকানের দুর্গটি দখল করার ছক কষছিল। তার গোটা শিবিরটিই ওখানে ফেলা হয়েছিল। তবে সান্তাজি ঘোরপাড়ে এবং তাঁর চরেরা সেই শিবিরের গোটা নকশাটি নিখুঁতভাবে জেনে নিয়েছিলেন।আপনারা দেবগিরির যাদবদের সময়কালে যা ঘটেছিল তার সঙ্গে এই ঘটনাটির তুলনা করতে পারেন। মাত্র পনেরো মেইল দূরত্বে কি ঘটছে না ঘটছে সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণাই ছিল না। সান্তাজি ঘোরপাড়ে গোটা শিবিরের নকশাটি খুঁজে পেতে সমর্থ হয়েছিলেন, কোথায় ঔরংজেবের তাঁবু, সৈন্যদের তাঁবুই বা কোথায় সবই তাঁর নখদর্পণে ছিল।

রাতের বেলা ঘোর অন্ধকারে তিনি প্রবেশ করতে পেরেছিলেন, তবে এক প্রহরী তাঁর পথ আটকেছিল। তাঁর সঙ্গে প্রায় পঞ্চাশজন সৈনিক ছিল, অর্থাৎ সান্তাজি ঘোরপাড়ের সঙ্গে, গোটা পরিকল্পনাটি ছিল এইরকম –ঔরংজেব যেখানে রয়েছে সেই তাঁবুতে গিয়ে তার মাথাটি কেটে সঙ্গে ক’রে বিশালগড়ে…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

শিবাজির দাক্ষিণাত্য অভিযানে যাওয়ার কারণ

post-image

 

এই কাজটি সেরে, অভিষেক সম্পন্ন হবার পর,ছত্রপতি শিবাজি দাক্ষিণাত্য অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন এবং তিনি একেবারে জিঞ্জী পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় আস্ত একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন, এটি আপনারা দেখতে পাবেন যে এটি ছত্রপতি শিবাজির গড়ে তোলা রাজত্বের একেবারে কেন্দ্রীয় অংশ। এটিই স্বরাজ্য, যা কারওয়ার থেকে শুরু ক’রে একেবারে নাসিকের উত্তরে, প্রায় গুজরাটের সীমা অবধি বিস্তৃত। তবে ১৬৭৬ সালে তিনি যে দাক্ষিণাত্য বিজয়ে বেরোলেন, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি  কারণ হ’ল, আদিল শাহীর রাজত্ব খুবই সম্পদশালী ছিল। আদিল শাহী রাজত্ব এই অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। এছাড়াও এ অঞ্চলে ছিল কুতব শাহী রাজত্ব। একবারে দক্ষিণদিকে বেশ কিছু প্রায়-স্বাধীন হিন্দু রাজাদের রাজত্ব ছিল, ফলে একটি কারণ ছিল এখানকার ধনসম্পদ।

দ্বিতীয়তঃ তিনি একটি বিকল্প হাতে রাখতে চাইছিলেন, অথবা পশ্চাদপসরণ করবার প্রয়োজনে স্বরাজ্যের দক্ষিণে একটি বিকল্প এলাকা খুঁজছিলেন, কারণ যদি উত্তরদিক থেকে কোনো আক্রমণ আসে, তাহলে যাওয়ার জায়গা কোথায়? সেক্ষেত্রে তাঁদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে, তাঁদের পিছু হটবার মতো একটা…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

মুঘল আগ্রাসনের আসন্ন বিপদ এড়াতে ছত্রপতি শিবাজি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন

post-image

 

এবার আমরা আসি দুর্গগুলির কথায়, আমি আগেই বলেছি কীভাবে দেবগিরির দুর্গটির জন্য যুদ্ধ হয়েছিল এবং সে যুদ্ধে পরাজয় ঘটেছিল। এবং শিবাজি যা করেছিলেন তা হ’ল – তিনি দুর্গ তৈরি করবার প্রণালীতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। তিনি একাধিক প্রবেশ এবং নিষ্ক্রমণের পথ তৈরি করিয়েছিলেন। আপনি যদি মহারাষ্ট্রে যান, তাহলে দেখতে পাবেন যে প্রত্যেকটি দুর্গের একাধিক প্রবেশ এবং নির্গমন পথ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এই হ’ল তোরনার দুর্গ, এখানে জুঞ্জার মাচির দিক থেকে একটি প্রবেশপথ রয়েছে এবং দুর্গের অপর প্রান্তে আরো একটি প্রবেশপথ রয়েছে বুধলা মাচির দিক থেকে। ফলে এতে একাধিক প্রবেশপথ রয়েছে।

তারপর তিনি অনুরূপভাবে স্থাপত্যের গঠন পাল্টালেন, তিনি রায়গড়ের মত দ্বি-স্তরীয় দেওয়ালবিশিষ্ট দুর্গ তৈরি করালেন। তিনি শুধুমাত্র এটা নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হলেন না যে দুর্গে যেন যথেষ্ট পরিমাণে শস্য মজুত থাকে, তিনি দেখলেন যাতে দুর্গটি স্বনির্ভর হতে পারে, যাতে সত্যিই দুর্গের ভেতরেই ফসল ফলানো সম্ভব হয়। যথেষ্ট পরিমাণে জলের ব্যবস্থাও করলেন। তিনি অনেকগুলি জলাধার তৈরি করালেন এবং বলতে…

Read More
ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ জানেন কি মধ্যযুগীয় ইতিহাস শ্রীমহাভারত

ছত্রপতি শিবাজির করা নানান সংস্কার এবং হিন্দভি স্বরাজের আদর্শটির গঠন

post-image

ছত্রপতি শিবাজি নানান শাসনতান্ত্রিক এবং সামরিক সংস্কারসাধন করেছিলেন, যা ভবিষ্যতে মারাঠাদের শক্ত ভিতে দাঁড় করিয়েছিল। এসবই লেখা আছে রামচন্দ্র পন্ত রচিত ‘আজ্ঞাপত্র’ নামের বইটিতে, আমরা পরে এই ব্যক্তিটির সম্পর্কে আলোচনা করব। তিনি ছত্রপতি শিবাজির শাসনকালে একজন অমাত্য অর্থাৎ কর আধিকারিক ছিলেন। তিনি অষ্ট প্রধানদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন এবং ভবিষ্যতে তিনি মারাঠাদের মধ্যে এবং মারাঠা রাজনীতির ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তবে সেই সময়ে ছত্রপতি শিবাজি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রবর্তন করেন, যেগুলি কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। সবার প্রথমে তিনি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কাজটি করেছিলেন তা হ’ল ওয়াতনদার প্রথার উচ্ছেদ।সেই সময় পর্যন্ত প্রতিটি দুর্গ কারুর না কারুর জায়গীর ছিল। প্রত্যেকটি দুর্গ ছিল পাকাপোক্তভাবে তৈরি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ, এবং প্রত্যেকটি ব্যক্তি, যাদের অধীনে এই দুর্গগুলি থাকত, অর্থাৎ প্রত্যেক দেশমুখ নিজেরাই হয়ে বসেছিল এক একজন রাজা। তিনি এইসব জমির ইজারা নেওয়া সুবিধেভোগীদের উৎখাত করলেন এবং তার বদলে বেতনভোগী সৈন্যদল চালু করলেন। এই…

Read More
অযোধ্যার শ্রীরামমন্দির ইসলামী আক্রমণ মধ্যযুগীয় ইতিহাস সম্ভাষণের অংশবিশেষ হিন্দু মন্দিরগুলির অশুচিকরণ

মুসলিম আক্রমণকারীদের প্রতিমাবিদ্বেষের তত্ত্ব

post-image

তা সত্ত্বেও এইরকম বয়ান, অর্থাৎ তারা যে সত্যিই (মন্দির) ধ্বংস করেছে সেকথা অনেক এস্কিমোই সাম্প্রতিক কয়েক শতাব্দীতে স্বীকার করেছে। এটা কেবলমাত্র বর্তমানেই, অর্থাৎ গত কয়েক দশকেই দেখা যাচ্ছে যে প্রথমে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা এবং তাদের পিছু পিছু এস্কিমোরা এমন দাবী করছে যে মন্দির ধ্বংস করা তো হয়ইনি, এমনকী আদপে কোনো মন্দির ছিলই না। অথচ তার আগে এ ব্যাপারে যে বিজ্ঞানসম্মত ধারণাটি রয়েছে তা নিয়ে এস্কিমোদের কোনো সমস্যা ছিল না, তারা স্বীকার করত যে হ্যাঁ এখানে একটা মন্দির ছিল এবং হ্যাঁ আমরা সেটি ধ্বংস করেছিলাম। এবং কী ঘটেছিল সে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে চাইলে মন্দির ধ্বংস করবার পেছনে যে মতাদর্শটির প্রেরণা কাজ করছে, সেইটি আমাদের বেশ ক’রে খতিয়ে দেখতে হবে। অর্থাৎ এস্কিমোদের প্রতিমাবিদ্বেষের তত্ত্বটির কথা বলছি। এস্কিমো হানাদার বাবরকে শ্রীরামের মন্দিরের পূর্বতন রূপটির বিনাশকারী হিসেবে দায়ী করা হয়। এটি ওই মন্দিরের আদিরূপ না-ই হতে পারে, তবে ওই জায়গাটিকে একটি এস্কিমো উপাসনাস্থলের দ্বারা প্রতিস্থাপিত করবার জন্য বাবরকেই দায়ী করা হয়।

এখন ব্যাপার হচ্ছে যে সে…

Read More
ইসলামী আক্রমণ মধ্যযুগীয় ইতিহাস হিন্দু মন্দিরগুলির অশুচিকরণ

মূর্তিপূজার বিরোধীদের পাপ ধুতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী পণ্ডিতরা যেসব যুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করেন

post-image

এখন রিচার্ড ঈটন এমন কথা বলেছেন। তিনি একজন আমেরিকান এবং স্বঘোষিত কমিউনিস্ট অ্যাকাডেমিক এবং তিনি দাবি করেন যে হিন্দুরা যথেচ্ছ মন্দির ধ্বংস করেছে এবং এটাই তাদের চরিত্রগত খুঁত। বাস্তবে তিনি কিছুতেই এমন কোনো উদাহরণ খুঁজে পান না, স্রেফ হাতে গোনা কয়েকটা ঘটনা ছাড়া যেখানে হিন্দুরা মন্দির ধ্বংস করেবি, বরং মন্দিরের প্রতিমাটি অপহরণ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিমাটি নিজের অধিকারে রাখা একটা অহংকারের বিষয় ছিল, কখনো সেটি শিল্প হিসেবে অমূল্য ছিল ইত্যাদি। আর তাই শাসকরা সেটি হাতাতে চাইতেন এবং তাই নিয়ে যুদ্ধ লাগত। শেষমেশ দেখা যেত প্রতিমাটি অপহৃত হয়েছে, যেটা কিনা পরে বিজয়ী রাজার মূল মন্দিরে স্থান পেয়েছে এবং যে মন্দিরে সেই প্রতিমাটি পূর্বে ছিল তার কোনো ক্ষতি করা হয়নি, এবং অবশ্যই যে যুদ্ধে হেরে গেছে সেই রাজা তাঁর মন্দিরে একটি নতুন বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা ক’রে একইভাবে পূজা-অর্চনা চালিয়ে যেতে পারতেন।

ফলে, এই ব্যাপারটা এস্কিমোদের মূর্তিবিদ্বেষের থেকে একেবারে আলাদা ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই অবমাননা করা এবং শেষ অব্দি পরাজিতের ধর্মটিকে উচ্ছেদ করা,…

Read More
%d bloggers like this: