সোমবার, অক্টোবর 22, 2018
Home > ভারতীয় বীরগণ > ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ > মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধের ফলে বহু জায়গায় মুঘলদের পরাজয় ঘটেছিল

মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধের ফলে বহু জায়গায় মুঘলদের পরাজয় ঘটেছিল

তো এই ছিল ১৬৯০-এর দশকে সংঘটিত যুদ্ধের প্রভাব, যার ফলে মারাঠারা খুবই শক্তিশালীসৈন্যদল গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল। তারা এই একই গেরিলা যুদ্ধনীতির আশ্রয় নিয়েছিল যাতে আঘাত হেনেই দ্রুত পলায়ন করতে হয়, এটি আসলে ছিল দীর্ঘকাল ধ’রে বারবার আক্রমণ হেনে অপর পক্ষকে দুর্বল বানিয়ে ফেলবার যুদ্ধনীতি, এবং বহু জায়গায় এভাবে যুদ্ধ হয়ে থাকে।

এর ফলস্বরূপ মুঘল রাজকোষ একেবারে শূন্য হয়ে পড়েছিল। এই যুদ্ধে তাদের প্রতি বছর প্রায় ১৫০০০ লোকক্ষয় হচ্ছিল। শাহজাহান, জাহাঙ্গীরের সময়কার ধনরত্ন, একেবারে আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের সময়কাল থেকে সঞ্চিত ধনরাশি, লালকেল্লায় রক্ষিত যেসব সিন্দুক কোনোদিন খোলাই হয়নি, সেসবও খোলা হতে লাগল পাওনাদারের অর্থ পরিশোধ করবার জন্য। অনেক জায়গায় মারাঠারা কোনো একজন মুঘল সেনাপতিকে বন্দী ক’রে তার মুক্তিপণ হিসেবে অর্থ চাইত, পেয়ে গেলে তাকে ছেড়ে দিয়ে পিছু হটত। অনেক জায়গায় আবার দুর্গটিকেই বেচে দেওয়া হ’ত, প্রথমে দুর্গরক্ষার জন্যলড়ে যখন দেখা যেত যে লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব, তখন তারা অর্থ দাবী করত, অর্থ আদায় করত, দুর্গটি ছেড়ে দিত, সেই অর্থ ব্যবহার ক’রে ফের একটি সৈন্যদল গড়ে তুলত এবং ফিরে এসে সেই দুর্গটি দখল করত। কারণ মুঘলরা কেবলমাত্র দুর্গ অবরোধের রণনীতিতেই ভরসা করত, মাত্র একবার বাদে, সেকথায় পরে আসা যাবে, যখন তারা তোরনা দখল করেছিল। তারা কখনোই মারাঠাদের মতো অতর্কিতে আক্রমণ চালানোর কায়দায় ভরসা করত না, অথবা রাতের অন্ধকারের আড়ালকে ব্যবহার করত না। অনর্থক একগাদা লোক ব্যবহার করত, এবং প্রত্যেকবার অবরোধের নীতি অবলম্বন করত। তার ফলে দুর্গ দখল করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত এবং সেটি হাতছাড়া হতে বেশিক্ষণ লাগত না।

উপরন্তু এরই মধ্যে, ১৬৯০-এর দশকে মুঘল সেনাপতিরা, মুঘল সর্দারেরা আসলে এই যুদ্ধটির ব্যাপারে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিল, কারণ তারা সেখানে প্রায় ১৫ বছর যাবৎ ছিল, হয়ত বা প্রায় ২০ বছর ধ’রে ছিল, অথচতাদের ভাগ্যে কোনো শিকে ছেঁড়েনি।তারা প্রতিদিন কোনো না কোনো যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছিল, ফলে মারাঠাদের পক্ষে তাদের তাড়ানো খুবই সহজ হয়ে পড়েছিল, তাদের পরাজিত করা, তাদের থেকে অর্থ আদায় করা এবং মুক্তি দেওয়া এসব ছিল জলভাত। এবং এইভাবেই ঔরংজেব ১৫, ১৬ এমনকী ১৮ বছর ধ’রে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও খুব বেশি এলাকা দখল করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং যা কিছু দখল করেছিল সেসবও শীঘ্রই খুইয়ে বসেছিল, এবং খুব বেশিদিন ওগুলি নিজের কব্জায় রাখতে পারেনি।

১৬৯৮ নাগাদ যখন মহারাষ্ট্রের অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটল, তখন ছত্রপতি রাজারাম জিঞ্জী ছেড়ে এলেন, তিনি সেখানকার দুর্গ অবরোধের কবল থেকেও বেরোতে পেরেছিলেন। এখন তিনি কী উপায়ে বেরোতে পেরেছিলেন সেই নিয়ে নানান তত্ত্ব রয়েছে। ছত্রপতি রাজারাম এই ব্যাপারে অনেক কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, যার মধ্যে একটা হ’ল – তিনি জুলফিকার খানকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে তাঁকে ছেড়ে দিলে জুলফিকারের লাভ হবে। ঔরংজেবের বয়স তখন প্রায় নব্বই, সে মরণাপন্ন, এবং দক্ষিণ ভারতে মুঘল সর্দারেরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, ফলে সেসময় মারাঠাদের হাতেই ক্ষমতার চাবিকাঠি আসার কথা। ফলে জুলফিকার খান আর বেশিক্ষণ অবরোধ বজায় রাখেনি, যতক্ষণ তার করবার কথা ছিল। ততদিনে তার প্রায় আট বছর দুর্গ অবরোধ ক’রেথাকা হয়ে গিয়েছে। ফলে, একদিকে রামসেজ অবরোধ করেছিল ৬ বছর ধ’রে, অন্যদিকে জিঞ্জী অবরোধ করেছিল ৮ বছর ধ’রে। মুঘলেরা প্রায় ১৪ বছর ব্যয় করেছিল মাত্র দু’টি দুর্গের পেছনে এবং মহারাষ্ট্রে প্রায় ৩০০ দুর্গের দখল নিতে পেরেছিল।

Leave a Reply

%d bloggers like this: