সোমবার, অক্টোবর 22, 2018
Home > অবৈধ অনুপ্রবেশকারী > ভারত রাষ্ট্র এবং তাকে রোহিঙ্গা সমর্থকদেরকূট তর্কের দ্বারা হীন প্রতিপন্ন করা

ভারত রাষ্ট্র এবং তাকে রোহিঙ্গা সমর্থকদেরকূট তর্কের দ্বারা হীন প্রতিপন্ন করা

এখন, তার আগে আমাদের একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আমরা একটি জাতিরাষ্ট্রে বাস করি। যেহেতু আমরা জাতিরাষ্ট্রে বাস করি তাই কিছু ধারণা এবং অনুমান জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটির সঙ্গে চলে আসে, যার তাৎপর্য হ’ল আমার দেশের সীমানা রক্ষা করবার অধিকার আমার রয়েছে। ফলে, আমার সীমানা রক্ষা করবার ক্ষমতা এবং দায়িত্ব রয়েছে। এদিকে বিশ্বায়নের ফলে জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটিতেবাস্তবিক কোনো মূলগত পরিবর্তন ঘটেছে এমনটা আমি মনে করি না। এক্ষেত্রে আজকের সময়ের সবচেয়ে ভালো উদাহরণটি হ’ল ব্রেক্সিট। ঘটনা হচ্ছে যে আপনি চাইলেও পরিচিতিগুলিকে মুছে দিতে পারবেন না, জাতিগত পরিচয় মুছতে পারবেন না, কিংবা আপনি চাইলেও ধর্মীয় পরিচয় অথবা জাতীয় পরিচয় মুছে দিতে পারবেন না, অথবা জাতীয়তাবাদের ধারণাটি তর্কসাপেক্ষ নয়, জাতীয়তাবাদের ধারণাটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েনি, এই কথাগুলি আমাদের বিশেষ ক’রে বুঝতে হবে কারণ পুরো বিষয়টির কেন্দ্রে এগুলি রয়েছে, কারণ অপর পক্ষ আপনাকে যে যুক্তিটি দেবে তা হ’ল ভারত এমন একটি দেশ যার ইতিহাস জুড়ে কেবল অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে।এমনকী আমার টুইটার টাইমলাইনে একজন ভদ্রলোক আমায় বলেছিলেন যে ৭০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আরম্ভ ক’রে ১৯৪৭ পর্যন্ত যা যা ঘটেছে অর্থাৎ ধরা যাক মুসলিম আক্রমণ থেকে শুরু ক’রে ব্রিটিশদের প্রভুত্ব অব্দি সবই তাঁর মতে আসলে দেশান্তরিত হবার ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। আমি বুঝে উঠতে পারিনি তাঁর জন্য করুণা অনুভব করবো নাকি হেসে গড়িয়ে পড়ব। আমি ঠিক করলাম যে এই মূর্খটিকে উপেক্ষা করাই শ্রেয়। এরকম এক ব্যক্তির সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ার কোনো মানে হয়না। যদি কেউ আক্রমণ, দেশান্তর গমন, বাসস্থান স্থাপন এবং প্রভুত্ব কায়েম করার মধ্যে পার্থক্য করতে না পারে তাহলে তাকে ভগবান রক্ষা করুন। এমনকী তারপরে আমার মনে পড়ে যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই হয়তো কোনো বড়সড় গলদ রয়েছে, এবং আসলে সেটাই সত্যি কথা।

ফলে সমস্যাটি হচ্ছে এই দুটো বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার। দেখুন ব্যাপারটা হ’ল, সুবিধেজনক অবস্থানটি হচ্ছে এই যে ওরা যদি আইনি দিক থেকে গোলমেলে জায়গায় থেকে থাকে এবং যদি আইনের বিচারে নিজেদের সপক্ষে সাজাবার মতো যথেষ্ট যুক্তি না থাকে তাহলেই ওরা সঙ্গে সঙ্গে অন্য যুক্তিটির আশ্রয় নেবে, অর্থাৎ সভ্যতার এবং বিশ্বায়নের যুক্তিটির। আপনি কি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ে বাস করছেন যে আপনি ভাবেন জাতীয় পরিচিতি আর জাতিরাষ্ট্র এক, এবং এই ধারণাটির এখনো মুল্য আছে? অবশ্যই মুল্য আছে। কেন মুল্য থাকবে না? অবশ্যই মুল্য রয়েছে। ধ’রে নেওয়া যাক যে ভারতবর্ষ এমন একটি দেশ যেখানে শুধুমাত্র দেশান্তরীরা যুগে যুগে এসেছে, যেহেতু এর সবকটিই খুব শান্তিপূর্ণভাবে ঘটেছে। তাহলে এখনো কেন আর্যদের আক্রমণের তত্ত্বটি ক্রমাগত চালিয়ে যাওয়া হয়? একে আর্যদের দেশান্তর গমনের তত্ত্ব বলা হোক, সেটা আমরা মেনে নিলেও নিতে পারি, তা সে ঠুনকো হলেও, তার কোনো ভিত্তি না থাকলেও, বৈজ্ঞানিক দিক থেকে ভুল প্রমাণিত হয়ে থাকলেও।আপনি একদিকে এটা বলবেন যে আপনার শুধুমাত্র এই জাতিগোষ্ঠীটিকে নিয়েই সমস্যা রয়েছে যারা নাকি এই দেশকে আক্রমণ করেছিল এবং তারা দ্রাবিড়দের উপর অত্যন্ত নিপীড়ন চালিয়েছিল আর তারপরে আর্যদের আক্রমণের তত্ত্বটি ব্যবহার ক’রে একটা উদ্দেশ্যসাধন করতে চাইবেন আর অন্যদিকে বাকি সমস্ত আক্রমণকে ন্যায়সঙ্গত দেশান্তর ব’লে প্রমাণ করতে চাইবেন– এটা হয়না। আমি তো অন্ততঃ দেখতে পাচ্ছিনা যে কীভাবে এই দুটো যুক্তিই ন্যায্যতা লাভ করতে পারে, কিছু একটা মস্ত গোলমাল নিশ্চয়ই রয়েছে, আর আমার মনে হয়না যে এটা বোঝবার জন্য ১২০, এমনকী ১৫০ বুদ্ধ্যাঙ্কের প্রয়োজন পড়ে যে এই দুটি যুক্তির মধ্যেই কিছু না কিছু গোলমাল রয়েছে। আপনি আসলে এটা বলতেই পারবেন না যে দুটিই যুক্তিসঙ্গত এবং এদের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করা সম্ভব – একেবারেই সম্ভব নয়।

ফলে আমাদের বুঝতে হবে যে যতক্ষণ না আমরা এই ব্যাপারে একমত হচ্ছি এবং মেনে নিচ্ছি যে জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটি এখনোবৈধ এবং সেটিকে বৈধ থাকতে হবে। এর পরের সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করবার আর কোনো দরকারই নেই কারণ আপনি দেখতে পাবেন যে সেক্ষেত্রে আপনি শুধুমাত্র খুঁটিনাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। আপনি তৎক্ষণাৎ মনে মনে ভুল মেনে নেবেন, আপনি পুরনো দুনিয়ায় বাস করছেন, আপনি একটি ডাইনোসর, আপনি আধুনিক নন, আপনি ধর্মনিরপেক্ষ নন, আপনি উদার নন, এবং তার ফলে আপনি বিশ্বায়নের ধারণাটিকে নিজের মনের মধ্যে এবং বাস্তবিক জীবনে আপন ক’রে নেন নি, আর তাই আপনি কেবল আমার দেশ, আমার এলাকা, আমার সীমানা, এবং এইসব ফালতু বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে চলেছেন। যুদ্ধ করছেন কেন? যুদ্ধ-টুদ্ধ সব বেকার, আমি অত্যন্ত দুঃখিত। যুদ্ধই হোক, অথবা অন্য যেকোনো সমস্যাই হোক না কেন যেগুলির সম্মুখীন হয়েছি আমরা আজকের দিনে, সেগুলি সবই জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত –তা সে অন্ততঃ আমাদের বৈদেশিক সমস্যা হোক কিংবা এমনকী হয়তো আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলিই হোক না কেন। অভ্যন্তরীণ আগ্রাসনই হোক, তাকে নকশালপন্থা বলা যাক, অথবা বাইরে আগ্রাসনই হোক, দুটোই ভারত রাষ্ট্রের কাছে চ্যালেঞ্জ।

ভারত একটি জাতিরাষ্ট্র, অতএব সবার আগে জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটির অলঙ্ঘনীয়তারক্ষা করা অত্যন্ত দরকারি, তারপর এই প্রশ্নটি তোলা জরুরি যে তার সাথে এই বিশেষ সমস্যাটির যোগ কোথায়? যেমনটা আগেই বলেছি, আপনার সীমানার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবার ধারণাটি আসে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আপনার অধিকার থেকে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: