ত্রিদোষের ধারণা – ঋতুচক্রের সঙ্গে জড়িত অনুষ্ঠানগুলিতে আয়ুর্বেদিকযুক্তি এবং নীতি

এমনকী, যারা এই ঋতুচক্রের সঙ্গে জড়িত অনুষ্ঠানগুলি পালন করে তারাও এটা ভুলেই গেছে যে বেদসমূহ এবং ধর্মশাস্ত্রসমূহ, অথবা অন্য যে কোনো শাস্ত্রে বর্ণিত অধিকাংশ স্ত্রীধর্ম-সংক্রান্ত আচারগুলির আয়ুর্বেদিক ব্যাখ্যা রয়েছে, একটি আয়ুর্বেদিক দিক রয়েছে। আয়ুর্বেদে মাসিক ঋতুচক্রকে ত্রিদোষগুলির দ্বারা চালিত একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আমি ত্রিদোষগুলির ব্যাপারে বলেছি – বাত, পিত্ত এবং কফ। বাত বলতে আমাদের সমস্ত অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এবং গতিবিধিকে নির্দেশ করা হয়, যেমন প্রাণ, অপান ইত্যাদি ক্রিয়াগুলি হ’ল বাত। পিত্ত জড়িয়ে রয়েছে পাচনক্রিয়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ক্রিয়ার সঙ্গে। কফ কোনোকিছু ঘনীভূত হবার সঙ্গে সম্পর্কিত।এইগুলি হ’ল বিভিন্ন ধরণের ক্রিয়া, জৈব ক্রিয়া, এবং এগুলি চালিত হয় আমাদের দেহের ভিতরে স্থিত নানান শক্তির দ্বারা, বিভিন্ন জৈব এবং অনুরূপ শক্তির দ্বারা।

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে আয়ুর্বেদ অনুযায়ী সুস্বাস্থ্য হ’ল ত্রিদোষের সাম্যাবস্থা এবং অসুস্থ হওয়ার অর্থ হ’ল এই ত্রিদোষের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটা। অতএব, এর ভিত্তিতে গোটা মাসিক প্রক্রিয়াটিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয় – ঋতুকাল, ঋতুব্যতীত কাল, রজস্রাব কাল।রজস্রাব কাল হ’ল সেই সময় যখন আসলে ঋতুস্রাব ঘটে থাকে, এটি বাতের দ্বারা চালিত হয়। বাত অর্থাৎ অপান বায়ু, সেই শক্তি, যা বায়ুর শক্তিতে সবকিছু নীচে ঠেলে দেয়। ঋতুকাল শরীরকে ডিম্বাণু উৎপাদনের উপযোগী ক’রে তোলে। এটি কফের দ্বারা চালিত হয়। ঋতুব্যতীত কাল বলতে বোঝানো হয় সেই সময়টিকে যখন ক্ষরণ হতে থাকে, যখন ডিম্বাণু উৎপাদনের অব্যবহিত পূর্বে পরিপোষক পদার্থগুলি ক্ষরিত হয়। যখন ডিম্বাণু উৎপাদন বন্ধ থাকে তখন আসে রজস্রাব কাল।

অথচ আজকের দিনে আমরা মনে করি, আধুনিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঋতুস্রাবের সময় ব্যথা করা, খিল ধরা ইত্যাদি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে আয়ুর্বেদে বলা হয় যে এগুলো মোটেই স্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক ঋতুস্রাবে কোনোরকম ব্যথা হওয়া বা জ্বালা করা ঘটবে না, যেখানে অত্যল্প, যেখানে রক্তপাত অত্যল্পও হবে না আবার খুব বেশিও হবে না। অথচ বর্তমানে আমরা প্রায় ভুলেই গেছি যে স্বাভাবিক ঋতুস্রাব ব’লেও কিছু হয়। আমরা ভাবি যে ব্যথা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের জীবনশৈলী ঐ ত্রিদোষের এমন ভারসাম্যহীনতা এনে দিয়েছে যে প্রায় সমস্ত মহিলাই প্রায় সবসময় ব্যথা অনুভব ক’রে থাকেন।

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে স্বাভাবিক ঋতুস্রাব তখনই ঘটে যখন দোষগুলি ঠিক ঠিক সাম্যাবস্থায় রয়েছে। সুশ্রুত সংহিতা জানাচ্ছে যে অস্বাভাবিক ঋতুস্রাব তখনই ঘটে যখন বায়ু অর্থাৎ বাত, পিত্ত এবং কফবিক্ষুব্ধ হয়।এগুলি তখন বিক্ষুব্ধ অবস্থায় বিরাজ করে এবং দোষগুলির এই বিক্ষুব্ধ অবস্থাই নারীর স্বাস্থ্য, জৈব এবং শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলিতে ব্যাঘাত ঘটায় এবং এটি গর্ভধারণ করবার এবং প্রজননের ক্ষমতাকেও ব্যাহত করে।

You may also like...

Leave a Reply

%d bloggers like this: