মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর 25, 2018
Home > জানেন কি > রজস্বলা পরিচর্যা – আয়ুর্বেদের মতে ঋতুস্রাব চলাকালীন কি কি করণীয় এবং কি কি করণীয় নয়

রজস্বলা পরিচর্যা – আয়ুর্বেদের মতে ঋতুস্রাব চলাকালীন কি কি করণীয় এবং কি কি করণীয় নয়

 

ঋতুস্রাব চলাকালীন কি কি করণীয় এবং কি কি করণীয় নয় সে ব্যাপারে আয়ুর্বেদ একগুচ্ছ বিধি নির্দেশ করেছেন, যা রজস্বলা পরিচর্যা নামে পরিচিত। পরিচর্যা বলতে জীবনশৈলী বোঝায়।

মেয়েরা প্রতি মাসে তাঁদের তিনদিন ব্যাপী ঋতুমতী থাকবার পর্যায়ে কী ধরণের জীবনশৈলী মেনে চলবেন? চরকসংহিতা এই ব্যাপারে বিস্তারিত বলেছেন, ঋতুস্রাব শুরু হবার কালে তিন দিন তিন রাত ব্যাপী মেয়েরা ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করবেন, ভূমিশয্যা অবলম্বন করবেন, ভাঙাচোরা নয় এমন পাত্রেই হাত দিয়ে খাদ্যগ্রহণ করবেন, এবং কোনোভাবে নিজেদের শরীর পরিষ্কার করবেন না। এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত বলা হয়েছে, আমি এই তালিকাটি তৈরি করেছি, এই তালিকাটি একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, অ্যাকাডেমিক গবেষণাপত্রে,নীচেআমি যার উল্লেখ করেছি।এই তালিকায় দেখানো হয়েছে কি কি করণীয় এবং কি কি করণীয় নয়।

আমি ব্রহ্মচর্য পালন করা না করার কথা বলেছি। এছাড়া রয়েছে কুশের বিছানায় শোওয়া, অথবা মাদুর বা ঐরকম কিছুর উপর শোওয়া, তবে খাটে নয়। খাবার ব্যাপারে খুব হাল্কা কিছু খাওয়া উচিত, ঘি, শালি ধানের ভাত, দুধ ইত্যাদি হাল্কা পদার্থ দিয়ে তৈরি খাদ্য হ’লে ভালো হয়, যা সহজপাচ্য এবং যা খুব অল্প পরিমাণে এবং সরাসরি হাতে নিয়ে খাওয়া উচিত, কোনো ধাতব পাত্রে নয়, এবং সেই সময় শুভচিন্তায় মন একাগ্র করা উচিত। এই খাবার বিধিটি ভারি কৌতূহলোদ্দীপক। এর মূল কথাটি হ’ল হাল্কা খাবার খাবে এবং খুব কম পরিমাণে খাবে। এর কারণ হচ্ছে, ঋতুস্রাবের সময় শরীর এমন অবস্থায় থাকে যে তখন এটি ভারী খাবার হজম করতে পারে না। আয়ুর্বেদে এই অবস্থাকে বলা হয় অগ্নিমান্দ্য, অর্থাৎ পাচনশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অগ্নি এসময় অত্যন্ত দুর্বল, মান্দ্য অর্থাৎ দুর্বল।কাজেই তখন একে ভারী খাবার দেওয়া উচিত নয়, দুষ্পাচ্য খাবার দেওয়া উচিত নয়, মাংস অথবা ঐরকম কিছু দেওয়া উচিত নয়। খুব হাল্কা খাবার খাবে, যেমন শালি ধানের ভাত, যাকে বলে হবিষ্যান্ন। হবিষ্যান্ন হ’ল সেই হাল্কা খাদ্য যা যজ্ঞের আগুনে আহুতি দেওয়া হয় এবং এটি অল্প অল্প ক’রে দেওয়া হয়।

এছাড়া রয়েছে অন্যান্য বিষয়, ব্রহ্মচর্য ইত্যাদি। এই সব কিছুর উল্লেখ শুধুমাত্র এইজন্যে করা হয়েছে যাতে আপনার শরীরের দোষগুলি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং তাদের সাম্যাবস্থার ব্যাঘাত না ঘটে। এই পুরো তালিকাটির উদ্দেশ্য হ’ল দোষগুলির সাম্যাবস্থা বজায় রেখে শুধুমাত্রমহিলাদের স্বাস্থ্যরক্ষা করা। আপনি দিনের বেলায় ঘুমোলে, সাজগোজ করলে, স্নান করলে, তেল মাখলে, মাসাজ করালে, এর প্রত্যেকটি অগ্নিমান্দ্যের উপর প্রভাব ফেলে। এছাড়াও এটি সুস্বাস্থ্যবিধির উপর প্রভাব ফেলে, বেশি কথাবার্তা না বলা, চুল না আঁচড়ানো ইত্যাদি।

কিন্তু এই প্রভাবগুলি কীভাবে প্রকাশিত হয়? যখন আপনার সম্পূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়, তখন দেখা যায় যে পরবর্তীকালে যখন আপনি সন্তানসম্ভবা হন,তখন যদি এই আচরণগুলি পালন করেন…এটা স্রেফ এককালীন ব্যাপার নয়, যদি আপনি এমনটা প্রতি চক্রে বারংবার করতেই থাকেন, তখন এই অসাম্যটিও বারংবার ঘটতে থাকে। এর একেবারে বাড়াবাড়ি ঘটলে দেখা যায় যে যখন আপনি সন্তানসম্ভবা হয়েছেন, শিশুর জন্ম দিয়েছেন তখন সেই শিশুটির মধ্যে হয়তো কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে। এমন নয় যে এরকমটা সব ক্ষেত্রেই ঘটতে দেখা গেছে, এইগুলি হ’ল বহুদিনব্যাপী পর্যবেক্ষণ এবং নথিবদ্ধ করবার ফল। খুব বেশি হলে একেবারে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছলেই এমনটা ঘটতে দেখা যায়। তবে এগুলি ছাড়াও ত্রিদোষের ভারসাম্যহীনতার কারণে শরীরে অন্যান্য প্রভাব পড়তে দেখা গেছে। কাজেই, এই আয়ুর্বেদিক দৃষ্টিকোণটিকে একেবারেই হিসেবের মধ্যে ধরা হয়নি।

অগ্নিমান্দ্য ছাড়াও শোধনের ব্যাপারটি রয়েছে। শোধন হ’ল একটি আয়ুর্বেদিক প্রক্রিয়া, যাতে শরীরের ক্ষালন ঘটে। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে আয়ুর্বেদেই পরিষ্কার ভাষায় ঋতুস্রাবকে একটি শোধন প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, কারণ এটি ঋতুস্রাবের, অর্থাৎ, রজস্বলা পরিচর্যার জন্যও সেই একই ধরণের দৈনিক আচারবিধির বিধান দিয়েছে যা শোধন প্রক্রিয়ার জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এদের মধ্যে আটটি আচার একদম অভিন্ন। বিস্তারিত জানতে আপনারা আমার লেখা প্রবন্ধগুলি পড়ে দেখতে পারেন। কাজেই এটি একটি শোধন প্রক্রিয়া, যা স্বয়ং আয়ুর্বেদেও স্বীকার করা হয়েছে, আর এছাড়া আহত হবার ধারণাটিও রয়েছে, কারণ এতে আপনার শরীর থেকে এন্ডোমেট্রিয়ালকলা বেরিয়ে যায়। কাজেই একে এক ধরণের আহত অবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা সেরে উঠতে শুশ্রূষা এবং বিধিনিষেধ মেনে চলবার প্রয়োজন রয়েছে। এই তালিকাটি সেই দিকেও লক্ষ্য রেখেছে কারণ সেখানে বর্ণিত আচারগুলি এবং একজন আহত ব্যক্তি, যার উপর শল্যচিকিৎসার প্রয়োগ করা হয়েছে তার শুশ্রূষার জন্যে প্রবর্তিত আচারগুলির মধ্যে, কীভাবে বিশ্রাম নিতে হবে ইত্যাদির মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: